বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন
।। প্রফেসর ড. মিল্টন বিশ্বাস ।।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, বরং এটি এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর থেকে শুরু করে ১৯৪৬ সালে ক্যাপ্টেন আব্দুল গনির নেতৃত্বে বাঙালি পল্টনের আধুনিক রূপরেখা প্রণয়ন পর্যন্ত, এই বাহিনীর বিবর্তনের প্রতিটি ধাপ ছিল সংঘাত ও সংগ্রামের সংমিশ্রণ । বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বশান্তি রক্ষায় শীর্ষস্থানে থাকলেও এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত বিতর্কিত আখ্যানগুলো একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বাংলার সামরিক ঐতিহ্যের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। প্রাচীন বাংলার রাজাদের অধীনে পদাতিক, অশ্বারোহী, যুদ্ধহস্তী এবং যুদ্ধনৌকা নিয়ে গঠিত বিশাল সেনাবাহিনী ছিল, যার প্রধানদের বলা হতো সেনাপতি বা মহাসেনাপতি । মুসলিম শাসনামল এবং পরবর্তীকালে মুঘল শাসনামলে কামানের প্রচলন বাংলার সামরিক বাহিনীকে আরও আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করে তোলে । তবে ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশদের হাতে নবাবের পরাজয়ের পর বাংলার সামরিক কাঠামোতে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সম্পদ ব্যবহার করে তাদের শাসন পাকাপোক্ত করলেও ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর তারা বাঙালিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখাতে শুরু করে। এই সময়ে বিহার ও উত্তর প্রদেশের অ-বাঙালিদের “মার্শাল রেস” হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের নিয়ে বেঙ্গল স্যাপার্স এবং বেঙ্গল ক্যাভালরি গঠন করা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে ‘বাঙালি ডাবল কোম্পানি’ গঠিত হয়, যা করাচিতে প্রশিক্ষিত হয়ে বাগদাদে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং কুর্দি বিদ্রোহ দমনে ভূমিকা রাখে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ইন্ডিয়ান আর্মি পাইওনিয়ার কোর’ গঠিত হয় যেখানে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সৈনিকরা প্রকৌশলী এবং পদাতিক হিসেবে যুদ্ধ করে। এই বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ক্যাপ্টেন আব্দুল গনি বার্মা ফ্রন্টে সাহসিকতার সাথে নেতৃত্ব দেন । যুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে ক্যাপ্টেন গনি পূর্ব বাংলার সৈনিকদের নিয়ে একটি নিয়মিত পদাতিক রেজিমেন্ট গঠনের পরিকল্পনা করেন, যা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল স্যার ফ্রাঙ্ক মেসারভির অনুমতি সাপেক্ষে ‘বাঙালি পল্টন’ বা আধুনিক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চরিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এটি কেবল ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি সামরিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জনযুদ্ধ বা ‘লিবারেশন ওয়ার’-এর ফসল । এই যুদ্ধে বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তা, সাধারণ সৈনিক এবং বেসামরিক গেরিলা যোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যা বাহিনীর মধ্যে একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে। তবে স্বাধীনতার পর এই কাঠামোগত বৈচিত্র্য সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও উপদলীয় কোন্দল বা ফ্যাকশনালিজমের জন্ম দেয় ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার ইতিহাসের একটি বড় সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। স্বাধীনতার পর প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে ছিল এবং আদর্শগতভাবে তারা ভিন্নমতাবলম্বী ছিল । ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবাসিত বাঙালি কর্মকর্তারা ফিরে এলে সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ এবং ‘প্রত্যাবাসিত’ (Repatriated) কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন তৈরি হয় । এই বিভাজন পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে সামরিক বাহিনীকে শাসনের একটি বিধিবদ্ধ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাত্তারের ওপর এরশাদ চাপ সৃষ্টি করেন যাতে শাসন ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর একটি আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক ভূমিকা থাকে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ কোনো রক্তপাত ছাড়াই এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং ঘোষণা করেন যে “দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী” রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় দূর করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে । এই সময়ে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের ব্যবসায়িক ও সামাজিক প্রভাব বাড়ানোর বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর আশা করা হয়েছিল যে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে ব্যারাকে ফিরে যাবে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার চরম মেরুকরণ এবং সামরিক বাহিনীকে নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা সেনাবাহিনীকে পুনরায় রাজনীতির গুটি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেয় । দলীয়করণ ও রাজনীতিকীকরণ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতিকে দুর্বল করে তোলে এবং বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনী পুনরায় হস্তক্ষেপ করে একটি অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে । এই দুই বছরে সেনাবাহিনী কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি, বরং দুর্নীতি দমন এবং ভোটার তালিকা প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক কাজেও লিপ্ত হয় । এই সময়ে সেনাবাহিনীর কর্পোরেট স্বার্থ এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনমনে প্রবল কৌতূহল তৈরি হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ ক্ষমতার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বিভিন্ন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যা সামরিক বাহিনীর ‘বেসামরিকীকরণ’ প্রক্রিয়ার বিপরীত হিসেবে দেখা হয় ।
বাংলাদেশে সেনাবাহিনী পরিচালিত ব্যবসায়িক উদ্যোগসমূহ জাতীয় অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ‘সেনা কল্যাণ সংস্থা’ (SKS) এবং ‘আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ (AWT)-এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী আবাসন, ব্যাংকিং, হোটেল, টেক্সটাইল এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের মতো লাভজনক খাতে বিস্তৃত হয়েছে । এই ব্যবসায়িক মডেলকে অনেক সময় পাকিস্তানের ‘ফৌজি ফাউন্ডেশন’-এর সাথে তুলনা করা হয় ।
সেনা কল্যাণ সংস্থা মূলত অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এটি একটি বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘সেনা কল্যাণ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (SKCD) ২০০৯ সাল থেকে রিয়েল এস্টেট এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করছে । একইভাবে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে । ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড সেনাবাহিনীর একটি প্রধান আর্থিক উৎস, যার দেশব্যাপী ৪৪টির বেশি শাখা রয়েছে ।
সেনাবাহিনী পরিচালিত এই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সমর্থকদের মতে, এটি জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখছে, কর্মসংস্থান তৈরি করছে এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর চাপ কমাচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব, দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একই সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবাধিকার, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্বের প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অতীতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, এসব আলোচনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনা আমলে যৌথ বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জবাবদিহিতা ও সংস্কারের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবাধিকার-সচেতন নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে সহায়ক হতে পারে।
২০২১ সালে সম্প্রচারিত আল জাজিরার প্রামাণ্যচিত্র “All the Prime Minister’s Men” আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সেনাবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) তৎক্ষণাৎ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রতিবেদনটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করে। একই সঙ্গে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও পেশাদার সামরিক ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
নজরদারি প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে অধিকতর স্বচ্ছতা, নীতিগত ব্যাখ্যা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত প্রশংসিত। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দক্ষতা, মানবিকতা ও পেশাদার আচরণের জন্য সুনাম অর্জন করেছেন। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মানবাধিকার যাচাই-বাছাই এবং প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করার যে আলোচনা উঠেছে, তা সেনাবাহিনীর পেশাগত মানোন্নয়ন ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত কমিশন গুম ও নিখোঁজের অভিযোগ তদন্তে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অতীতের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মানবাধিকারের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।
সব মিলিয়ে, সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্যেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পেশাদারিত্ব, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা। একটি দায়িত্বশীল ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল শক্তির নয়, বরং জবাবদিহিতা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে সম্মান অর্জন করে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংগঠিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে রূপ নেয়, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে কারফিউ জারি ও আন্দোলন দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন । কিন্তু ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার জেনারেলদের সাথে জরুরি বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেন যে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাবে না।
সেনাবাহিনীর এই ‘ডিফেকশন’ বা পক্ষত্যাগ ছিল শেখ হাসিনার শাসনের পতনের মূল কারণ। বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর এই সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ ছিল: ১. আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ । ২. সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর ক্ষেত্রে সৈনিকদের মধ্যে প্রবল অনীহা ও অস্বস্তি । ৩. আন্তর্জাতিক চাপ এবং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন হারানোর ভয় ।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সেনাপ্রধান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অরাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে । এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী ‘কিং মেকার’ বা স্থিতিশীলতার প্রধান জামিনদার হিসেবে আবির্ভূত হয় ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে জনবল সরবরাহের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬,৮০০-এর বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছে । এই মিশনগুলো কেবল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস নয়, বরং এটি সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হয়।
তবে এই আন্তর্জাতিক সফলতার পাশাপাশি মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার প্রশ্নেও বৈশ্বিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের মানবাধিকার রেকর্ড আরও কঠোরভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগের আগে প্রত্যেক সদস্যের পেশাগত ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট অতীত কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতীতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের পেশাদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে এই বৈশ্বিক আলোচনাগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা, অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ এবং মানবাধিকার সচেতনতা আরও শক্তিশালী করার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হলে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তার দীর্ঘদিনের সুনাম আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।
আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন তথ্য ও আখ্যানের (Rhetoric and Narratives) যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক কৌশলগত চিন্তাধারায় ‘ইনফরমেশন ডোমেইন’ বা তথ্যগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে । ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে সেনাবাহিনী বুঝতে পেরেছে যে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি ‘ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস’ এবং ‘কাউন্টার ডিসইনফরমেশন’ বা অপপ্রচার বিরোধী সক্ষমতা অপরিহার্য।
সেনাবাহিনীর নিজস্ব জার্নাল অনুযায়ী, তথ্যের অসামঞ্জস্যতা (Information Asymmetry) এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আখ্যানগুলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে । তাই সেনাবাহিনী এখন ‘কন্ট্রোল ওয়ারফেয়ার’ বা নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে বড় কোনো সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র শক্তিও কেবল সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জয়ী হতে পারে । এই সক্ষমতা অর্জনের জন্য সেনাবাহিনী ডিজিটাল এমপ্লিফিকেশন এবং ডিটারেন্স স্টোরিটেলিং বা ভীতি প্রদর্শনমূলক আখ্যান তৈরির কৌশল রপ্ত করছে।
২০২৪-এর পরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব পালন করে । বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা ভেঙে পড়ায় সেনাবাহিনী প্রায় দেড় বছর ধরে রাজপথে থেকে ‘ম্যাজিসটেরিয়াল পাওয়ার’ বা বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি বজায় রেখেছে ।
২০২৬-এর নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ২১২টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে এবং জামায়াত-এ-ইসলামী দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয় । এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান । নির্বাচনের সময় প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয় যাতে কোনো অরাজকতা না ঘটে । সেনাবাহিনী এই নির্বাচনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে এবং কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয়নি, যা দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই চার্টার’ নামক একটি সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে । এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল বলে মনে করা হয়, কারণ তারা একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে।
সেনাবাহিনী কেবল যুদ্ধ বা রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য। সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোর (ECBs) দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক নির্মাণ, মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ এবং ঢাকার বড় বড় ফ্লাইওভার নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছে । তাদের সুশৃঙ্খল কাজের ধারা এবং দ্রুত গতিতে প্রকল্প শেষ করার ক্ষমতা বেসামরিক প্রশাসনের তুলনায় অনেক বেশি প্রশংসিত।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার সময় সেনাবাহিনী যেভাবে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা পুনরায় ফিরিয়ে এনেছে । তারা উদ্ধারকাজের জন্য নৌকা, হেলিকপ্টার এবং উচ্চ-পানির যানবাহন ব্যবহার করে লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয় । প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সেনাবাহিনীর এই ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন যে, এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে তাদের বীরত্বগাথা এবং জাতীয় উন্নয়নে অসামান্য অবদান, অন্যদিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ব্যবসায়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তাদের ভাবমূর্তিকে মাঝেমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তারা যে অদম্য দেশপ্রেম এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে নৈতিক সাহসিকতা দেখিয়েছে, তা তাদের সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর প্রধান কাজ হওয়া উচিত বহিঃশত্রুর হাত থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে থেকে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে আনা প্রয়োজন যাতে করে তারা তাদের মূল রণকৌশলগত লক্ষ্যগুলোতে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। এছাড়া অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে শান্তি রক্ষা মিশনে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হতে পারে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার গৌরবময় ঐতিহ্য বজায় রেখে একটি শক্তিশালী, আধুনিক এবং বিতর্কহীন বাহিনী হিসেবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে- এটাই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
( ড. মিল্টন বিশ্বাস- লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট এবং সেক্রেটারি, ইক্যুমেনিক্যাল খ্রিষ্টান ট্রাস্ট-ইসিটি Email- writermiltonbiswas@gmail.com)
https://books2read.com/b/mKL0Vd



