সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করবেন না : দিলারা চৌধুরীর বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাখ্যান
।। প্রফেসর ড. মিল্টন বিশ্বাস ।।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি আস্থার প্রতীক। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা জনগণের স্মৃতিতে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। তাই এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দায়িত্বহীন, বিভাজনমূলক কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য জাতির জন্য কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।
সম্প্রতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর(১১/৫/২০২৬) কিছু বক্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, তাঁর বক্তব্যে সেনাবাহিনীকে একটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনার চেষ্টা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি মৌলিক অধিকার হলেও সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও জড়িত। বিশেষ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কথা বলার সময় সংযম, বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, যার প্রতি কোটি মানুষের আবেগ ও আস্থা জড়িয়ে আছে।
রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনায় দেখা যায়, আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের বিশ্বাস। দার্শনিক থমাস হবস রাষ্ট্রকে সামাজিক স্থিতি ও নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবে দেখেছিলেন। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায়, রাষ্ট্রের বৈধ ক্ষমতা পরিচালনার জন্য একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো প্রয়োজন। সেই কাঠামোর অন্যতম অংশ সেনাবাহিনী। ফলে যখন রাজনৈতিক বিতর্কে সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে ফেলা হয়, তখন তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা বহুবার দেখেছি, রাজনৈতিক বিভাজনের আগুন যখন উসকে উঠেছে, তখন জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করার প্রবণতাও বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কখনো ইতিবাচক হয়নি। একটি পেশাদার বাহিনীকে রাজনৈতিক ভাষ্য, দলীয় ব্যাখ্যা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষোভের উপাদানে পরিণত করা হলে জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবেশ দুর্বল হতে পারে।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম বলেছিলেন, সমাজের ঐক্য রক্ষায় কিছু প্রতীক ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিত আস্থার জায়গা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হয়। সেনাবাহিনী সেই ধরনের একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। দুর্যোগ, বন্যা, মহামারি কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করেছে, তা দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বপরিসরে শক্তিশালী করেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়- এমন বক্তব্য জনগণের বৃহৎ অংশের মধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করে।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও রাষ্ট্রীয় আস্থার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতি যখন তার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস হারাতে শুরু করে, তখন সামাজিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক সন্দেহ বাড়তে থাকে। দায়িত্বশীল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও মতামত প্রদানকারীদের তাই ভাষা ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। সমালোচনা থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন রাষ্ট্রীয় স্থিতি ও জাতীয় মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
গণতন্ত্রের শক্তি সংঘাতে নয়, ভারসাম্যে। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান- সবাই মিলে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে। সেখানে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা কোনো সুস্থ চর্চা নয়। বরং প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
বাংলাদেশ আজ অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। এই সময়ে জাতীয় ঐক্য সবচেয়ে বড় শক্তি। সেনাবাহিনীকে ঘিরে বিভ্রান্তি, সন্দেহ বা অযাচিত বিতর্ক সৃষ্টি করা সেই ঐক্যের জন্য সহায়ক নয়। ব্যক্তি মতের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের মনে রাখতে হবে-রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা মানে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করা।
সুতরাং, দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা-সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের হাতিয়ার বানানো হবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে সংযম, রাষ্ট্রবোধ এবং জাতীয় দায়িত্বশীলতা।
( ড. মিল্টন বিশ্বাস- লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট এবং সেক্রেটারি, ইক্যুমেনিক্যাল খ্রিষ্টান ট্রাস্ট-ইসিটি Email- writermiltonbiswas@gmail.com)
https://books2read.com/b/mKL0Vd




