২৬শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, বিকাল ৫:৫৭
নোটিশ :
Wellcome to our website...

হিজড়া সম্পর্কিত কিছু জানা অজানা কথা

রিপোর্টার
শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

এই তো গত রোববার (২৮/১১/২০২১ইং) ঝিনাইদহ জেলাধীন কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) স্বতন্ত্র প্রার্থী (আনারস প্রতীক) নজরুল ইসলাম ঋতু নৌকার প্রার্থী নজরুল ইসলাম ছানাকে রেকর্ড পরিমাণ ভোটে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আর এর আগে কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী সাদিয়া আক্তার পিংকী সরাসরি ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। যাহোক, নির্বাচনের এই চমকটি নিয়ে সামাজিক গণমাধ্যম, অফিস-আদালত, হোটেল- রেস্তোরা, দোকান ও হাট বাজার সহ বিভিন্ন জনপদে আলোচনার ঝড় উঠে। তাই ভাবলাম, সম্মান্বিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে হিজড়া নিয়ে কিছুটা একটা লেখা দরকার। অবশ্য এ ব্যাপারে অনেক তথ্যাদি আগেই সংগৃহীত ছিল বিধায় এ ব্যাপারে জানা- অজানা কথা নিচে তুলে ধরা হলোঃ
এক) এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, প্রকৃতির অমোঘ খেয়ালে মনুষ্য সমাজে যে মানব সন্তান জন্ম গ্রহণ করে; অথচ নারী বা পুরুষ কোন লিঙ্গেরই অধিকারী হয় না। সেই অদ্ভুত তৃতীয় প্রকৃতির মানব সন্তানকে হিজড়া বা উপলিঙ্গ বা উভয় লিঙ্গ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। আর হিজড়া কেবল মানুষের মধ্যে যে সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয়। পশু-পাখীদের মধ্যেও এটি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তবে কেঁচোর ব্যাপারটি আলাদা। যাহোক, এই হিজড়া সম্প্রদায়ের মানবগুলো আগেই ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও জন্মাবে। সেহেতু প্রতীয়মান হয় যে, মানব সমাজ যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত হিজড়া সম্প্রদায় আবহমান কাল ধরে চলতে থাকবে। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্যর হিজড়া সম্প্রদায় জন্মের জন্য কোন মতেই তারা দায়ী নয়। এমনকি তার পিতামাতাও দায়ী নন। এটা নিছক প্রকৃতির একটি পরিহাসমূলক কর্মকান্ড। জীববিজ্ঞানীগণ এই তৃতীয় প্রকৃতির বা হিজড়া মানব সন্তান জন্মের রহস্যকে এখন পর্যন্ত উম্মোচন করতে পারেননি। তাঁরা একে কেবল বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোন একটা সঙ্কট বা বাড়তি বা ঘাটতি বলে ক্ষান্ত হয়ে বসে না থাকলেও তেমন একটা কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। উল্লেখ্য যে, হিজড়া সন্তানের জন্মের পর আধুনিক চিকিৎসায় বা অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে কোন লিঙ্গের অধিকারী হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়ার ব্যাপারটা জটিল হলেও অনেকাংশে সম্ভব। কিন্তু না না কারণে অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টার পরও প্রতিবন্ধকতার কারণে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ফলশ্রæতিতে হিজড়া সম্প্রদায় একই বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও অন্য ছেলে-মেয়েদের মতো সম্মানযোগ্য অবস্থানে নেই। তারা প্রচলিত মানব সমাজের, রাষ্ট্রের ও পরিবারের কাছে হচ্ছে সদানিয়ত বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্যগত কারণে এবং আচরণে হিজড়া সম্প্রদায় অন্য মানুষের মতো প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে এবং অপর একটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দায় রূপান্তরিত হয়ে সমাজে উপেক্ষিত জীব হিসেবে কালাতিপাত করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের প্রতি এই বৈষম্যগত আচরণ এবং অবহেলা তার পরিবার, সুশীল সমাজ, এমনকি তারা জন্মগতভাবে যে রাষ্ট্রের নাগরিক, সেই রাষ্ট্রের মধ্য থেকেও অনেক দূরে। তাছাড়া কোন ধর্মেও ধর্মীয় অনুশাসনের আওতা ধরে তাদের নিয়ে তেমন ভাবে মাথা ঘামানো হয়নি। যেহেতু সব মিলে তাদের নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি পুরাপুরি মেলেনি। তাই মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত একটি অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হিসেবে বিদ্যমান এবং প্রকারান্তরে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবেতর অপরিচ্ছন্ন জীবন-যাপন করে চলেছে। আসলে তারা উভয় লিঙ্গ হলেও কোনটিও কার্যকরী নয়। প্রধানত এদের দুটি বৈশিষ্ট্যগত ধরনঃ যেমন-

ক) প্রকৃতিদত্ত এবং খ) মানুষের হাতে সৃষ্ট।

সারা পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ধরন প্রায় একই। তবে জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসাবিদরা লৈঙ্গিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ছয়টি ধরন চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু মানুষের হাতে সৃষ্ট লৈঙ্গিক বিকৃতিগ্রস্ত হিজড়াদের ধরন ও জীবনপরিণতি স্থানীয় সংস্কার, নিয়ম, সামাজিক প্রথা এবং আর্থ-সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। কিছু হিজড়াকে অকুয়া বলা হয়, যারা দৈহিকভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারী স্বভাবের। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ইংরেজী Eunuch শব্দটি “হিজড়ার” প্রতিশব্দ হিসেবে অধিক প্রচলিত। এদিকে Hermaphrodite ইংরেজী প্রতিশব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে উভয় লিঙ্গ। এর স্বপক্ষে গ্রীক পুরানে একটি সুন্দর কল্প কাহিনী আছে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, হার্মাফ্রোদিতাস ছিলেন আকর্ষণীয় মায়াবী চেহারার একজন আলোচিত গ্রীক দেবতা। হার্মাফ্রোদিতাসের বাবার নাম হার্মেস এবং মায়ের নাম আফ্রোদিতি। আফ্রোদিতি ছিলেন সৌন্দর্য, প্রেম ও যৌনতার দেবী এবং রোমান পুরানে তিনি ভেনাস বলে অভিহিত। বাবা হার্মেস ছিলেন দেবদূত। আর হার্মাফ্রোদিতাস ছিলেন তাঁদের অবৈধ সন্তান। শুধু তাই নয়, বাবা ও মায়ের দু’জনের নাম মিলিয়ে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল হার্মাফ্রোদিতাস (হার্মেস+আফ্রোদিতি)। ছোটবেলায় জল-পরীরা হার্মাফ্রোদিতাসের দেখাশোনা করতো। তাঁরা থাকতো ফ্রাইজিয়া নামক স্থানে ইডা পর্বতের একটি গুহায়। আর এ গুহাতেই হার্মাফ্রোদিতাসের শৈশব ও কৈশোর কেটে যায়। যখন তিনি সদ্য প্রাণবন্ত পনের বছরের কিশোর। তখন এখানে থাকতে থাকতে একঘেয়েমি হয়ে উঠছিল বিধায় বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই এক ঘেয়েমী কাটাতে পাশের লাইসিয়া ও কাবিয়া শহরে ঘুরতে যান। এক পর্যায়ে হার্মাফ্রোদিতাস আনমনা হয়ে ঘুরতে ঘুরতে পাশের পাহাড়ী অরণ্যে এসে পড়েন। এদিকে সেই বনে বাস করতো একটি ঝর্ণাকে ঘিরে ঝর্ণাপরী সালমাসিস। সেই ঝর্ণার চারিদিকে ছিল অপরূপ নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং তরুরাজি ও বিহঙ্গের কলাকাকলীতে মুখরিত। সেদিন কি মনে করে ঝর্ণাপরী সালমাসিস বাইরে না যেয়ে ফুল তুলছিল ঝর্ণার পাশে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে সৌন্দর্যের অপূর্ব মোহনীয় কিশোর হার্মাফ্রোদিতাসকে। আর তাঁকে দেখেই সালমাসিস প্রেমে পরে যায় এবং তখন সে সরাসরি হার্মাফ্রোদিতাকে ভালোবাসা এবং কামনার কথা জানায়। কিন্তু কিশোর হার্মাফ্রোদিতাস এর কোন পাত্তাই দেন না। এমনভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় অপমানিত হয়ে সালমাসিস দৌড়ে বনে চলে যায়। আসলে এটা ছিল তার একটা ভান মাত্র। কেননা অদূরেই একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে সে হার্মাফ্রোদিতাসকে আপন মাধুরী দিয়ে দেখছিল। এর মধ্যে হার্মাফ্রোদিতাস ভাবলেন হয়তো আপদ দূর হয়ে গিয়েছে। এদিকে ঝর্ণার স্ফটিক স্বচ্ছ জলে ¯œানরত অনিন্দ সুন্দর হার্মাফ্রোদিতাসকে দেখে সালমাসিস আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না এবং তাঁর একান্ত সান্নিধ্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে। আসলে সালমাসিস চাইছিলেন হার্মাফ্রোদিতাসকে সম্পূর্ণরূপে নিজের করে কাছে পেতে। অথচ হার্মাফ্রোদিতাস আপ্রাণ চেষ্টা করে দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলেন। এতে সালমাসিসের বুক ভেঙে যাচ্ছিল এবং কান্না আর ধরে রাখতে পারছিলো না। তখন উপয়ান্তর না দেখে ঈশ্বরের কাছে চিৎকার করে বর চাইলেন যে তাদের দু’জনের যেন চিরদিনের জন্য এক করে দেন। ঈশ্বর এ বিষয়টিকে কৌতুক বোধ করলেন এবং সালমাসিসের করুন আর্তনাদমূলক প্রার্থণা তাৎক্ষনিকভাবে পূরণ করে দিলেন। তখন সাথে সাথে দু’জনের শরীর একত্র হয়ে যায়। এতে এই দু’জন অর্থাৎ নারী ও পুরুষের দেহ মিলিয়ে একটি দেহ হয়ে দাঁড়ায়। সেই ক্ষণে হার্মাফ্রোদিতাস নিজের শরীরে এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে তাঁর বাবা-মাকে স্মরণ করলেন এবং তাঁদের কাছে অতি দুঃখে প্রার্থণা করেন যে, কেউ যদি এই ঝর্ণার জলে কখনও স্নান করে, সেও যেন তাঁর মতো হয়ে যায়। যাহোক, হার্মাফ্রোদিতাস পুরুষ হয়েও মেয়েলী হয়ে যায়। তাঁর শরীরে নারী-পুরুষ উভয়ের অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্যের আদলে অংশ বিশেষ ফুটে উঠে। আর সেই থেকে গ্রিক পুরাণের এই উপখ্যানে দাবি করা হয় যে তৃতীয় লিঙ্গ বা উপ লিঙ্গ বা হিজড়াদের উৎপত্তি এভাবেই নাকি হয়েছে এবং একই সাথে বিশ্বাস করা হয় যে, হার্মাফ্রোদিতাস হলো মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম হিজড়া। এখানে উল্লেখ্য যে, গ্রীক দেবতার উক্ত হার্মাফ্রোদিতাস নামের অপভ্রংশপূর্বক হিজড়ার ইংরেজী শব্দ Hermaphrodite এ রূপ নেয়। আর বাংলায় হিজড়া শব্দটি এসেছে ফারসী “হিজ” শব্দ থেকে। অবশ্য এর সমর্থক শব্দের মধ্যে ক্লীব, নপুংসক, খোজা, বৃহন্নলা, ছিন্নমুষ্ক, ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দুই) প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে, xx এবং xy ক্রোমোজোমের আওতায় শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়ের আধিক্যজনিত ত্রুটির কারণে এরা জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের জন্মের পর লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয় বিধায় হিজড়া বলে অভিহিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, তারা পুরুষালী হলেও মেয়েলী আচরণ করতে বেশী ভালবাসে। এদিকে গ্রীক পুরানের মতো আমাদের দেশে ঊনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত হিজড়া শিশু জন্মের কারণ নিয়ে অনেক কুসংস্কার ও কল্পকাহিনী প্রচলিত ছিল। কিন্তু ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ক্রোমোজোম সম্পর্কিত গবেষণায় অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করায় এবং সেই আঙ্গিকে নবজাতকের লিঙ্গ নির্ধারণের পথটি বৈজ্ঞানিকভাবে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। তবে জটিলতা এখনও আছে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না যে, কেন হিজড়া শিশু জন্মে? আসলে এটি প্রকৃতির একটি বিচিত্র খেয়াল বই কিছু নয়। এদিকে ক্রোমোজোমের সূত্র ধরে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়ের অস্বাভাবিকত্বের জন্য পুরুষ বা মেয়ে লিঙ্গের মধ্যে পড়ে না। আর লিঙ্গ অনির্ধারণ সম্বলিত এই শিশুটিই তথাকথিত “হিজড়া সন্তান”। প্রকৃত পক্ষে জন্মগত দিক দিয়ে হিজড়া সাধারণত তিন প্রকার, যা নিম্নোক্ত ছকের আলোকে দেখানো হলো। অবশ্য আর এক প্রকারের হিজড়া আছে, যার ছদ্মবেশী কৃত্রিম হিজড়া।

ক) একদিকে একটি শুক্রাশয় ও একটি ডিম্বাশয় এবং অপর দিকে একটি শুক্রাশয় অথবা ডিম্বাশয় থাকবে।
খ) একদিকে ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয় এবং অপরদিকে একটি ডিম্বাশয়।
গ) একদিকে একটি ডিম্বাশয় এবং অন্যদিকে একটি শুক্রাশয়।

আসলে এই ধরণের অধিকাংশ হিজড়াই পুরুষালী। তবে মূত্র ছিদ্র স্বাভাবিক স্থানে থাকে। অনেকের পুরুষাঙ্গ না থেকে যোনি থাকে। তবে নারীদের মতো স্বাভাবিক যোনি থাকে না। মুত্রালী ও যোনিপথ এক সাথে থাকে। কৈশোরে এদের মধ্যে স্তন গ্রন্থির কিছুটা প্রকাশ ঘটে এবং কারো কারো মাঝে-মধ্যে অল্প বিস্তর ঋতু চক্র দেখা দেয়, তবে তা যথাযথ নয়। এছাড়া এমন অনেক মানুষ রয়েছে, যারা মূলত ছদ্মবেশী হিজড়া। হিজড়াদের জন্ম প্রসঙ্গ ও তাদের জীবনমান উন্নয়ন ও বিশ্লেষণে, একটি কথাই বলতে হয় যে আমাদের দেশের কুসংস্কার ও অজ্ঞতার জন্যে কিছু হিজড়ার জীবনের উপর নেমে আসে অমানবিক সামাজিক সিদ্ধান্ত, যার কারণে নিগৃহীত হয়ে থাকে।
তিন) প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসা বিজ্ঞানে হিজড়া বলে কিছু নেই। হিজড়া কথাটি আমাদের সমাজেরই তৈরি। বাবা-মা দু’জনের জিন ঘটিত সমস্যা থাকলে, তাঁদের শিশু হিজড়া হতে পারে। অবশ্য এক্ষেত্রে বাবা-মা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু উভয়ের কাছ হতে ত্রুটিপূর্ণ জিন পাওয়ায় শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর শরীরে হরমোনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। অল্প বয়সে ধরা পড়লে এর চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের হিজড়া শিশুদের ব্যাপারে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এদিকে দুঃখের বিষয় হলো যে মানুষ জানেই না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিজড়াদের চিকিৎসা এদেশেই সম্ভব। ছোট বেলাতেই হিজড়া শিশুকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে রয়েছে। এটা না করে তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে হয়তো এরাও অন্য দশজনের মতো যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বাস করতে পারতো। অথচ হিজড়া শিশুর জন্ম দেওয়ায় অধিকাংশ বাবা-মা ও পরিবার সামাজিকভাবে লজ্জা ও গ্লানিতে ভোগেন, ফলে একটা বড় অংশ সম্পূর্ণরূপে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থাকে। সাধারণত বাংলাদেশে হিজড়ারা নিজেদের একটি আলাদা সমাজ তৈরি করে বসবাস করছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিজড়া সমাজ একই ধারায় গড়ে উঠেছে। এই উপমহাদেশের মতো হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ইউরোপসহ পাশ্চাত্য বিশ্বে হিজড়া বা জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধীরা তাদের পরিবারের সাথেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও সঙ্গী খুজে নিয়ে সংসার করে। আর প্রায় উন্নত দেশে হিজড়াদের উপর সামাজিক ও পারিবারিক সহানুভ‚তি রয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে হিজড়াদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বিদ্যমান। তারা নিজেদের মধ্যে আলাদা চাল-চলন, আইন-কানুন, এমনকি নিজস্ব জীবনযাত্রার ভাষা তৈরি করে মূল স্রোত থেকে সরে গিয়ে গড়ে তুলেছে এক স্বতন্ত্র উপ- সমাজ। হিজড়াদের সমাজে নেতৃত্ব দেন গুরু মা। হিজড়া সম্প্রদায়সহ অধিকাংশ গুরু মায়েরা মূল স্রোতে ফিরে আসতে চান না। তাছাড়া সমাজও হিজড়াদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন অনুভব করে না। এ কারণেই বাংলাদেশের হিজড়া সমাজ সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর ওপর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও তথ্য নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, এ পর্যন্ত কোন শুমারীতে হিজড়াদের তথ্য সংগৃহিত হয়নি। এদিকে বাংলাদেশের হিজড়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সূত্র ধরে বাংলাপিডিয়া তথ্যানুযায়ী প্রথমবারের মতো দেখা যায়, এদেশে হিজড়ার সংখ্যা ১ লক্ষ ৫০ হাজারের কাছাকাছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের উচ্চ বিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা হিজড়ারা সঙ্গবদ্ধ হয়ে আলাদা সমাজ গড়ে তুলেছে। আর এই হিজড়া সমাজে বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো তাদের সকলের সমান অধিকার বিদ্যমান। অবশ্য উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী হিজড়াকে পারিবারিকভাবে চিকিৎসা এবং তৎপর পুর্নবাসন করে স্বাভাবিক জীবনে ধরে রাখতে সচেষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু নি¤œবিত্তের প্রায় সকল জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী হিজড়া সন্তানরা। এই সম্প্রদায়ে আসতে বাধ্য হয়। এদিকে কথিত আছে যে আগে দলভারী করার জন্যে সুন্দর শিশু বাচ্চাকে হিজড়ারা অপহরণ করে তাদের যৌন অঙ্গহানি করতো। তাছাড়া বাংলাদেশের অনেক বাবা-মা লোক লজ্জার ভয়ে তাদের গুপ্ত লিঙ্গের এই হিজড়া সন্তানকে স্বেচ্ছায় হিজড়া পল্লীতে দিয়ে আসে। কেননা বেশির ভাগ পরিবারের হিজড়ারা সহানুভ‚তি পায় না। এদিকে গুপ্ত লিঙ্গের সন্তানদের এ বিষয়টি সমাজ ও পরিবারের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। এই দুঃখজনক কারণে তারা পরিবারের বা সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এভাবেই পরিবারের সাথে তৈরি হয় দূরত্ব। তারা এ কারণে হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ এবং সামাজিক এই অসঙ্গতির কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় হিজড়া দলে চলে যায়। বাংলাদেশের হিজড়াদের মধ্যে রয়েছে সুসম্পর্ক, বিশেষ করে গুরু মায়েদের ছত্র ছায়ায় এরা সারা দেশে সুগঠিত চেইন অব কমান্ড রয়েছে। এদেশের হিজড়াদের মধ্যে দুটি ধারা বিদ্যমান যেমন- অ) পেশাদার যৌন কর্মী এবং খ) গান করা হিজড়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, এই দুই গ্রুপের মধ্যে ঠান্ডা দ্ব›দ্ব চলতেই থাকে। এ প্রেক্ষাপটে নাচ-গান করা হিজড়ারা যৌন কর্মীদের সমপর্যায়ের মনে করে না। কেননা তাদের মতে ওরা সমকামী পুরুষ। এদিকে যৌনকামী হিজড়া বলে অভাবের তাড়নায় তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় বিধায় এ পথ বেছে নিয়েছে। যাহোক, আমরা ভুলে যাই, ওরা আমাদের আপনজন। তাদের শিক্ষার হার বাংলাদেশের গড় শিক্ষা হারের থেকে অনেক নিচে। আর হিজড়াদের শিক্ষার হার কম হওয়ার কারণে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হতে পারে না। দরিদ্র পরিবারের যৌন প্রতিবন্ধীরাই মূলত সমাজে হিজড়া হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে এমনিতেই তাদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ কম। তাছাড়া দারিদ্র্যের সাথে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিক‚ল পরিবেশ হিজড়াদের শিক্ষার সুযোগ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বঞ্চিত করে থাকে। এ কারণেই তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে প্রতিনিয়ত প্রতিক‚ল পরিবেশ তীব্রভাবে প্রবিন্ধকতা সৃষ্টি করছে। একদিকে যেমন শিক্ষার সুযোগ নেই, তেমনি চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে হচ্ছে একইভাবে বঞ্চিত। এক্ষেত্রে পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, হিজড়া সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো সার্বিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, প্রাচীনকাল থেকে হিজড়াদের একমাত্র পেশা “তোলা” সহ নবজাতকে নিয়ে ঢোল বাজিয়ে নাচ গান করা। কেননা হিজড়াদের দিয়ে নাচ-গান করালে নাকি সন্তানের মঙ্গল হবে এমন একটা ধারণা প্রাচীন সমাজের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তাছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানে কমেডিয়ান ও চিত্তরঞ্জক হিসেবে আমন্ত্রিত হতো। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে যুক্তিনির্ভর সমাজে এ সব অবৈজ্ঞানিক প্রথা দিন দিন হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় হিজড়াদের এ পথে উপার্জন তুলনামূলক কমে গেছে। তাই নবজাতকে নাচানো পেশা হ্রাস পাওয়া এবং বাজারে তোলা তুলে জীবন চলছেনা বিধায় তারা অন্য পেশায়ও চলে যাচ্ছে। কিন্তু সামাজিক প্রতিবন্ধকতার জন্যে ইচ্ছা থাকা সত্বেও হিজড়ারা পছন্দীয় পেশায় আসতে পারছে না। এ কারণেই দিনে দিনে যৌন পেশা ও চোরা চালানের মতো ঘৃণ্য জীবিকার স্বার্থে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ সমাজ সজাগ হলে এবং মানবতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আগালে ও যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলে অন্যান্য পেশায়ও পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে। কেননা হিজড়াদের বুদ্ধ্যঙ্ক সাধারণ মানুষের চেয়ে কোন অংশে কম নেই।
চার) ইদানিং ঢাকা মহানগরীতে চাঁদাবাজি ও এলাকার আধিপত্য নিয়ে হিজড়া সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেশ প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পারস্পরিক ঝগড়া ঝাটিতে আবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া আসল হিজড়ারা ছদ্মবেশী হিজড়ারূপে পুরুষ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, কিছু অসুস্থ মানসিকতার পুরুষ অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে লিঙ্গ কর্তনপূর্বক কৃত্রিমভাবে হিজড়ায় রূপান্তর হয়ে জোট বেঁধে প্রকৃত হিজড়াদের উপর সদানিয়ত জোর জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। যতদূর জানা যায়, শ্যামলী, ধামরাই ও খুলনার ফুলতলায় কয়েকটি গোপন বেসরকারি ক্লিনিকে পেশাদার ডাক্তার দিয়েই পুংলিঙ্গ কেটে হিজড়ার পরিণত হয়। আর এরাই ঢাকাসহ সারাদেশে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও খুন-খারাবিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্ম তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা এই সমস্ত অপকর্ম করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এদের শুধু পুংলিঙ্গই কাটা হয় না এবং একই সাথে বিশেষ হরমোন সম্বলিত ঔষধের মাধ্যমে দৈহিক পরিবর্তন আনা হয়। আর মানুষের হাতে সৃষ্ট এই হিজড়াদের Chinni বলা হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এ পুরুষরা কেন এই মূল্যবান সম্পদমূলক লিঙ্গ ছেদন করে হিজড়া সাজে? অবশ্য এর পিছনে যে কারন নিহিত, তা হলো একদিকে চরম দারিদ্র। অন্য দিকে অসুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির আবর্তে অতি লোভের বশবর্তী হয়ে অল্প সময়ে নিরাপদে অর্থ উর্পাজন করার এটা সহজ পথ বলে মনে করে। তাছাড়া হিজড়ার প্রতি সমাজ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থারা এদেরকে অসহায় ভেবে তাদের উপর সাধারণ মানুষের চেয়ে তুলনামূলক দুর্বল থাকে। সেহেতু হিজড়ারা সেই সুযোগ নিয়ে থাকে। আর যতদূর খবর নেয়া হয়েছে, তাতে জানা যায় যে, এই পুংলিঙ্গ কর্তন করতে একটি ডাক্তার ন্যূনতম পনের হাজার টাকা নিয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, হিজড়াদের মধ্যে কারও কারও রয়েছে প্রচুর সম্পদ। তবে তারা কিভাবে এ সম্পদ গড়েছে, সে ব্যাপারে পুরোপুরি সুনিশ্চিত না হওয়া গেলেও; যতদূর জানা যায় তাতে প্রতিভাত হয় যে, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসীদের আশ্রয়সহ না না অপরাধমূলক কর্মকান্ডের পথ ধরে তাদের হাতে অর্থের সমাগম হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সারা দেশের হিজড়াদের কর্মকান্ড সম্পর্কে ততটা বাস্তবভিত্তিক তথ্যাদি না থাকলেও যতদূর জানা যায়, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, রাজধানীসহ আশ-পাশের হিজড়ারা তাদের মতো করে নিজস্ব ধারায় জীবন যাত্রা গড়ে তুলেছে। এ সূত্র ধরে তথ্য মতে জানা যায় যে, ঢাকায় ছয়জন গুরুর অধীনে ৫টি জোনে বিভক্ত, যেমন- ক) শ্যামপুর, ডেমরা ও ফতুল্লায় গুরু লালন হিজড়া। খ) শ্যামলী, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের গুরু হামিদা হিজড়া। গ) নয়া বাজার ও কোতোয়ালির গুরু লাল হিজড়া। ঘ) সাভার ও ধামরাইয়ের গুরু মনু হিজড়া এবং ঙ) পুরান ঢাকার গুরু দিপালী হিজড়া। আর্থিক আয়ের প্রেক্ষাপটে নিজেদের পেশা অনুসারে এদের আয়ের পরিমান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, নবজাতকের উৎসবে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, দোকানে দোকানে চাঁদা আদায় ১০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা, যৌন কর্মী হিসেবে ০ থেকে ৩০০ টাকা। তাছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রতো আছেই। তবে বলতে গেলে আদায়ের পুরা টাকাই গুরুর হাতে চলে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, নবজাতকের ক্ষেত্রে কাজের বুয়ারা সোর্স হিসেবে কাজ করে। আরও উল্লেখ্য যে, রাতের আঁধার নামলেই বনানীস্থ কাকলী ব্রীজ সংলগ্ন স্থান, ফার্মগেট, পরীবাগ ফুট ওভারব্রিজ, মহাখালী ফুট ওভার ব্রীজের নিচে, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সংসদ ভবন এলাকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় পতিতাবৃত্তিতে নেমে পড়ে অনেক হিজড়া। অনেক ক্ষেত্রে পতিতার আড়ালে করে ছিনতাই। এমনও দেখা গেছে যে অধিক রাতে পথচারীরা ওভার ব্রিজগুলোতে উঠলে তাদের ডাকে সাড়া না দিলে আর নিস্তার নেই, টানাহেঁচড়া শুরু করে দেয়। আসলে সামগ্রিক অপরাধ জগতে হিজড়াদের নেতিবাচক কর্মকান্ড কম দায়ী নয়? এক্ষেত্রে যতো না প্রকৃতিগত হিজড়ারা করে থাকে, তার চেয়ে বেশী জড়িত নকল হিজড়ারা। এ সব নামধারী হিজড়া না না ছুঁতো ও বাহানা করে দলবেঁধে বাসা বাড়িতে যেয়ে অর্থ আদায় করে থাকে এবং অবস্থার প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, পতিতাবৃত্তি, মারামারি, এমনকি খুন খারাবিও করে থাকে। এদের দু:সাহসিক চাঁদবাজির দৌরত্ব যে কত ভয়ানক, সে ব্যাপারে একটি বাস্তব ঘটনা সঙ্গতকারণেই তুলে ধরার প্রয়াসী হয়েছি। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ হোম মেকার্স নামক একটি এ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ সংস্থার (প্রাইভেট) বনশ্রীতে (মসজিদ-ই-মনোয়ারের পাশের্^) কুঞ্জছায়া নামে এ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণাধীন একটি প্রকল্পে বিগত ০২/১২/২০২১ইং তারিখ বেলা এগারোটার সময় অপু নামে হিজড়াসহ চারজন হিজড়া এসে বিশ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে। এত টাকা সংশ্লিষ্ট কেয়ার টেকার রাজু দিতে অস্বীকার করায় তার উপর চরাও হয়। সে তখন উপায়ন্তর না দেখে সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: শামীম আহমেদকে ফোনে অবহিত করলে সে প্রেক্ষিতে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশী সহায়তা নিয়ে প্রশমিত করলেও হিজড়ারা ফিরে যাওয়ার সময় এই মর্মে হুমকী দেয় যে, “আবার আমরা আসবো, তখন তোদের পুলিশ বাবা কি করে ঠেকায়, তা আমরা দেখবো”। যেভাবেই বলি না কেন, মানবজাতির সামষ্টিক দেহের মধ্যে হিজড়া সম্প্রদায় একটি ফোঁড়া হিসেবে পরিগণিত। বৈশিষ্ট্যগত দিক দিয়ে এদের মধ্যে কোন সুশৃঙ্খল ধারা নেই। এদিকে হিজড়া সম্প্রদায়কে কেউ খুব একটা ভাল চোখে দেখে না। তাছাড়া ঠাট্টা ও হাসস্পদের মধ্যে দিয়ে কোণঠাসা করে রেখেছে। সেহেতু তাদের মধ্যে ধিক্কার সুলভ মনোভাব ঘনীভূতির মাধ্যমে তারা সর্বদা Inferiority Complex এ ভোগে। এ সব অনাহুত কারণে সব মিলে হিজড়ারা হয়ে উঠে বেপরোয়া, নিলর্জ্জ, জেদী বা গোঁয়ার। আর সেই আবেশে, যা ভাবে বা চিন্তা করে সেটাকে সম্পন্ন করতে উঠে পড়ে লাগে। তখন তাদের আর কোন লাজ-লজ্জার বালাই থাকে না। এতদ্ব্যতীত প্রাচীনকাল থেকেই খারাপ কাজের সাথে সাথে হিজড়াদের অনেক ভাল কাজের বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। সেই সময়ে রাজ-রাজরা অন্দর মহলে তাদের পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ করতেন। বাদ্য যন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন পোশাকে নাচ ও গান-বাজনা করে মনোরঞ্জন করতো। তাছাড়া যতদূর জানা যায়, বাইতুল মোকাদ্দাস, মদীনা ও মক্কা শরীফে সাকী-উল-হারামাইন শরীফাইন অর্থাৎ পানি পিলানী ওয়ালা হিসেবে অবদানও কম নয়? বর্তমানে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে অন্যান্য কাজে সবিশেষ ভ‚মিকা পালন করে থাকে, যেমন- যাত্রা, নাটক, চলচিত্র, ইত্যাদিতে এদের অংশগ্রহণ প্রণিধানযোগ্য। ইদানিং কর, ভ্যাট, ঋন, ইত্যাদি আদায়ের জন্য অনেক দেশে তাদেরকে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। এদিকে যত কথা বলি না কেন, তারা তো মানুষ। তাই যত অপরাধ করুক না কেন এবং ধর্ম নিয়ে মাথা না ঘামালেও এক সময়ে নৈতিকমূল্যবোধ আসা অস্বাভাবিক নয়? এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালে নাটোরের জমির প্রমানিক নামক এক হিজড়া নিজের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে প্রথম হজ্ব ব্রত পালন করেছে, যা কম কথা নয়? একটি খুশীর খবর হলো যে, ২০১৯ সালের (এপ্রিল-২০১৯) ভারতীয় লোকসভা নির্বাচনে তৃতীয় লিঙ্গের আওতায় হিজড়া ভোটার ছিল ৩৩,৩১৯ জন।
পাঁচ) পরিশেষে এই কথাই বলবো যে, সমাজের সাধারণ মানুষের বিরূপ আচরণ হিজড়াদের রাজনৈতিক, নাগরিক ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। হিজড়াদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা ভোট দেয়ার মতো নাগরিক কর্মকান্ডে উৎসাহ বোধ করে না। অন্যদিকে কটুক্তিসহ নিরাপত্তাহীনতা হিজড়াদের আর একটি সমস্যা। আর এ কারণেই পুলিশ থেকে শুরু করে মাস্তানদের হাতে বিভিন্নভাবে নাজেহাল ও নির্যাতিত হতে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, বয়সকালে যেনোতেনো ভাবে চললেও বৃদ্ধকালীন সময়ে অনেক হিজড়ার নিঃসঙ্গ মানবেতর জীবন যাপন করে থাকে। যারা নিজেদের পরিবারের সাথে থাকে, তাদের জীবনেও ঘনিয়ে আসে না না রকম সমস্যা। মূলত বৃদ্ধ বয়সে হিজড়াদের অবস্থা সাধারণ বৃদ্ধদের তুলনায় বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কেননা তাদের সন্তান সন্তুতি না থাকায় বৃদ্ধ বয়সে দেখা শোনার মতো তেমন কেউ থাকে না। যাহোক, বর্তমান সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তাদের নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে এবং তাই আশা করবো এই ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে। হিজড়াদের প্রতি সহানুভুতিশীল আচরণ, যা প্রকারান্তরে স্বাভাবিক জীবনে আসতে সহায়তা করবে। সেই উদ্দেশ্যে সবাই যদি এগিয়ে আসে, তাহলে হিজড়াদের মানসিকতায়েও পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি। এক্ষেত্রে সরকারের পাশপাশি হিজড়াদের পুর্নবাসন নিজ নিজ পরিবার থেকে গৃহীত কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণ অনেকটা রহিত হতে পারে এবং অনেকাংশে নিশ্চিত হতে পারে তাদের মৌলিক অধিকার। কেননা সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও সমান সুযোগ সুবিধা প্রদান বাংলাদেশের সংবিধানে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে বিদ্যমান। সেহেতু সবাই যদি সহানুভ‚তির মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে। তাহলে আর সেই দীর্ঘ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আর একই সাথে সবার মাথায় এই কথাটি রাখতে হবে যে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার দারুণ অভাব বিধায় এই জনগোষ্ঠীকে যে কোন ভাবে শিক্ষিত করা আবশ্যক। কেননা শিক্ষার আলো পেলে তারা তাদের সামাজিক ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে অবহিতপূর্বক এবং সেই আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্যে সচেষ্ট হয়ে উঠবে। এদিকে হিজড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রটিও অত্যন্ত নাজুক। তাই এক্ষেত্রে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, অসংলগ্ন এবং অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে যে কঠিন বা দুরারাগ্য ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; তা থেকে যাতে পূর্বাহ্নেই সচেতন থাকে। এতদ্ব্যতীত স্বীকৃত ও দলবদ্ধ হিজড়াদের অধিকাংশ দরিদ্র ও নিম্ন বিত্ত পরিবারের বিধায় তারা দলবদ্ধ জনগোষ্ঠী হয়ে না না অসামাজিক ও অনৈতিক কাজের সাথে যাতে জড়িয়ে না পড়ে; সেক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ তুলে ধরে সঠিক পথে আনায়ন করতে হবে। আর একটি কথা মনে রাখতে হবে, তারা একই দেশের আলো বাতাসের মানুষ। সেহেতু তারা যাতে অন্যান্যদের মতো বিভিন্ন ধরনের সেবাধর্মী সুযোগ সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে একটি কথা বলে পরিসমাপ্তি টানছি যে, তাদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করলে সমাজের আর দশটি মানুষের মতো মানব সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে। তখন সমাজ তথা রাষ্ট্রের আর কোন দায় হিসেবে থাকবে না।

সহায়ক সূত্রাদি ঃ
০১। Survey Report of Hijra Community of Khulna Division, Losauk, October-2013
০২। দৈনিক আমাদের সময়- ২৯/১১/২০২১ইং
০৩। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন- ১৯/১০/২০১৩ইং
০৪। সাপ্তাহিক বর্তমান দিনকাল- ১১-১৭ মে ২০১২ইং
০৫। দৈনিক দিনের শেষ- ৫/১০/২০১২ইং,
০৬। বাংলাপিডিয়া (১০ম খন্ড) সখে-হ্যালি।
০৭। ড. শামীম, উপদেষ্টা, মডার্ণ হার্বাল লিঃ, ঢাকা।
০৮। মো: শামীম আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ হোম মেকার্স।
০৯। বিভিন্ন সামাজিক গণ মাধ্যম।
১০। চলমান বাস্তব অভিজ্ঞতা।

লেখক: বিশিষ্ট অথর্নীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর