৩রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, সন্ধ্যা ৬:২৭
নোটিশ :
Wellcome to our website...

Unwholesome demand দ্বিতীয় পর্ব

রিপোর্টার
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:২৭ অপরাহ্ন

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান।।

  বাজে চাহিদাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হচ্ছে মাদকের চাহিদা। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে বিভিন্ন দেশে প্রায়ই যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে  কিছুদিনের জন্য মাদকের ব্যবহার কমে,  আর মাদকের দাম বাড়ে। এছাড়া তেমন কিছু লাভ হয় না। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন কিছু নয়।  কলম্বিয়া ও মেক্সিকোতে  ত্রিশ বছর ধরে এই যুদ্ধ চলছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে পৃথিবীর যেখানেই মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে সাময়িকভাবে কিছুটা দমন করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদী কোন ফল আসেনি। কলম্বিয়াতে গত ২৬ বছর ধরে অভিযান চলছে সেখানে এই অভিযানে এই পর্যন্ত প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে,  কিন্তু দেখা গেছে ওখানে কোকেনের চাষ আরও বেড়েছে। দেশের ভূখণ্ডের ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি এখন কোকেন সম্রাটদের দখলে। কোকেন সম্রাটদের রকেট লাঞ্চার সজ্জিত নিজস্ব সেনাবাহিনী আছে। আফগানিস্থানে আমেরিকার ড্রোন উপেক্ষা করে কোকেনের চাষ বাড়ছে। ২০০৮ সালে যা ছিল মাত্র ২০০ টন বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার টন। আশঙ্কা করা হচ্ছে অতি শীগ্রই তালেবানরা আফগানিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে,  তখন এই তালেবানি শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র ফসল হিসেবে কোকেনকেই বেছে নেয়া হবে বলে অনেকের বিশ্বাস।

সুতরাং supply-side নিয়ে কাজ করলে মাদক নির্মূল করা যাবে না। আমাদের এর demand-side নিয়ে কাজ করতে হবে। এই বাজে চাহিদাটি ক্রমাগত কেন বেড়ে যাচ্ছে তার কারণ  খুঁজতে হবে । আসলে মানুষ নেশা করবেই। মানুষ হাজার বছর ধরে নেশা করে আসছে। আমাদের দাদা-দাদী,  নানা-নানী তামাক, হুক্কা এসব খেতেন; পানের সাথে জর্দা খেতেন, এইসবও নেশা। গাঁজা,  চরস,  আফিম  এসব নেশার ইতিহাস হাজার বছরের। নেশা যারা করে তারা কেন করে? নেশা করার একমাত্র না হলেও অন্যতম কারণ হচ্ছে ‘কাজ না থাকা’। আমরা যারা নেশা করি না এর মূল কারণ হচ্ছে আমরা কাজে ব্যস্ত থাকি। মাদক নির্মূল করতে হলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে।  শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থার সুস্থ্য সংস্কার না করে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। আমাদের বিনোদন কোন ধরনের ব্যবস্থাই আর অবশিষ্ট নেই,  মাঠ নেই,  লাইব্রেরী নেই, সিনেমা হল নেই, নাট্যশালা নেই, পার্ক নেই, বেড়ানোর জায়গা নেই। মানুষ করবে কি? ছাত্রদের ভালো নেশা ধরিয়ে দিতে হবে, বই পড়ার নেশা, খেলাধুলার নেশা- এসব ভালো নেশার মধ্যে যদি এদের  ঢুকিয়ে দেওয়া না যায় তারা তো মাদকের নেশা করবেই।

মাদক নির্মূলে পৃথিবীব্যাপী লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে। মাদকবিরোধী অভিযানে হাজার ১৯০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার লক্ষ লোক মারা গেছে কেবল কলম্বিয়াতেই। ২০০৩ সালে থাইল্যান্ডের মাদক বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রথম তিন মাসেই ২৮০০ লোক মারা গেছে। মেক্সিকোতে ২০১২ সালে মারা গেছে ১২০০০ । পরের বছর সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১লক্ষ ২০ হাজার। এরপর শুরু হয় নিখোঁজ হওয়া। তারপরও মাদক কিন্তু থেমে নেই। তাই ভয়াবহ অবস্থা দমন করার জন্য দেশে দেশে কম্বিং অপারেশন চালানো হয়। আমাদের দেশেও এরকম অপারেশনের নজির আছে, কিন্তু ফলাফল হতাশাব্যঞ্জক।  তাই এই ভয়াবহ অবস্থা দমন করার জন্য আমাদেরকে ডিমান্ড সাইডের প্রতি নজর দিতে হবে। মাদকের ক্যারিয়ার(বাহক) হিসেবে সাধারণত এতিম ছেলেমেয়েদের টার্গেট করা হয়। কম বয়সি মাদকাসক্তরাও এক ধরনের এতিম।  এতিম আবার দুই প্রকার-  প্রকৃতই যাদের বাবা-মা নেই,  আরেক ধরণের এতিম  হলো যাদের বাবা মা আছে কিন্তু তাঁরা বাবা মায়ের স্নেহ ভালোবাসা বঞ্চিত। যাদের কেউ নেই অথবা থেকেও নেই তাঁরা একটা সময় একাকী হতাশ হয়ে পড়ে, তখন এদের অবলম্বন হয় মাদক। তাই আমরা পারিবারিক,  সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বগুলোতে যদি নজর না দেই তাহলে শুধুমাত্র মাদকের সাপ্লাই চেইন বন্ধ  করার চেষ্টা চালিয়ে সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে আমরা রক্ষা পাবো না। নিচের দিকে ঢালু থাকলে পানি গড়িয়ে  নামবেই। চাহিদা থাকলে সরবরাহের অভাব হবে না।

ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ,জঙ্গিবাদ এগুলো এক ধরনের নেশা। অনেকে বলেন জঙ্গিদের কোন ধর্ম নেই আসলে জঙ্গিদের ধর্ম ছাড়া আর কিছুই নেই। মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬) তাঁর ‘সংস্কৃতির কথা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার,  আর কালচার শিক্ষিত মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা- সৌন্দর্য,আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিত হওয়া। ধর্ম হচ্ছে কোন বৃহত্তর সংস্কৃতির একটি উপাদান মাত্র। ধর্ম কারো একমাত্র নেশা হতে পারেনা। হলি আর্টিজান ঘটনায় জড়িত জঙ্গীরা ক্যাপ্টাগন নামক এক ধরনের মাদক গ্রহণ করেছিল বলে ভিসেরা পরীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। ক্যাপ্টাগন ‘আইএস’ ড্রাগ নামেও পরিচিত। ক্যাপটাগণ খেলে অনেক দিন না ঘুমিয়ে থাকা যায়। স্বাভাবিক চেতনা বিলুপ্ত হওয়ার পর একের পর এক খুন করতে পারে। বিভ্রান্ত ধর্ম বিশ্বাসের আফিম আর নিউরো প্রযুক্তির ক্যাপ্টাগন এর প্রভাবে জঙ্গিরা হয়ে উঠে হিংস্র থেকে হিংস্রতর। এই নেশাগুলো থেকে মানুষদের সরিয়ে আনতে হলে তাকে আরেকটি ভালো নেশা ধরিয়ে দিতে হবে। খেলাফত কায়েম করতে গিয়ে ‘রক্তের ফোটা  জমিনে পড়ার সাথে সাথে বেহেশতের  নিশ্চয়তায়’ বিশ্বাসীরা এখন শুধু মাদ্রাসা থেকেই আসছে না,  ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণী থেকেই বেশি আসছে। অতএব কেবল মাদ্রাসাকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে যৌনাচারে বিকৃতির কথা প্রায়ই খবরে আসে কিন্তু তাদের মধ্যে ব্যাপক হারে মাদকাসক্তির খবর আসে না। কারণ ধর্ম নিজেই নাকি একটি নেশা । এটা আমার কথা নয়,  মাও সেতুং বলে গেছেন। অতএব ধর্মীয় নেশার কারণে তারা বাজারের অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে  বিরত থাকছে।  সমাজে যারা অন্যান্য ক্ষতিকর নেশা করছে,  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শত চেষ্টা (ক্রসফায়ার সহ) করেও তাদেরকে দমাতে পারছে না এবং পারবেও না। শুনেছি মাদক দমন করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য নিজেই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। কক্সবাজারের ওসি প্রদীপ কান্ডের মত উদাহরণগুলো নাইবা দিলাম। কারণ মানুষ নাকি নেশা ছাড়া থাকতে পারে না। সে একটা নেশা করবেই। অতএব সমাজের জন্য ক্ষতিকর নেশাগুলো থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য ভালো নেশা ধরিয়ে দিতে হবে। ব্যাপক সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যুবসমাজকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে  সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং সমাজসেবার নেশায় ঢুকে যাবে।  তখন সে ড্রাগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

তাছাড়া অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর নেশা দিয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর নেশার মোকাবেলা করা যেতে পারে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি  ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী অতিসম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, “মদের নেশা থেকে যুবকদের ফেরাতে হলে ‘বিয়ার’ উন্মুক্ত করে দিতে হবে” (ইউটিউব এর খবর, সত্য মিথ্যা জানি না)। ইদানিং দেখা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে বৈধ নেশা হিসাবে গাঁজা স্বীকৃতি পাচ্ছে।  ঔষধি গুন এবং থেরাপেটিক ব্যবহার বাড়ার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় গাঁজার ব্যবহার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে বিশ্বে গাঁজার মার্কেট ছিল ১০.৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২৬ সালে ৯৭.৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।  অর্থাৎ প্রতি বছর গাঁজার ব্যবহার ৩২.৯ শতাংশ হারে বাড়ছে।  ঔষধি এবং বিনোদন ড্রাগ হিসেবে গাঁজার ব্যবহার অনেকটা পণ্য পরিমার্জন ও বৈচিত্র্যকরণের (product modification and diversification) ধাঁচেই হচ্ছে । আমাদের এই বঙ্গভূমি একসময় গাঁজা উৎপাদনের স্বর্গভূমি ছিল। ‘নওগাঁ গাজা উৎপাদনকারী সমিতি’ এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম কৃষি বাজারজাতকরণ সমিতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছিল। গাঁজা চাষের আরেকটা উপকারিতা হচ্ছে এর ফল, ফুল এবং পাতা নেশা হিসেবে ব্যবহার করা হলেও আঠারো শতকে  গাঁজা গাছ থেকে উৎপাদিত সুতা  ছিল মানুষের সুতা বা কাপড়ের অন্যতম প্রধান উৎস      (১৯৬০ সালে DoPont কোম্পানির উৎপাদিত নাইলনের ব্যাপক ব্যবহারের পূর্ব পর্যন্ত)। যে সকল দেশে গাঁজার ব্যবহার বাড়ছে তার চেয়ে অনেক সহজে বাংলাদেশে গাঁজা উৎপাদন সম্ভব। আইনগতভাবে এদেশে গাজা খাওয়া নিষিদ্ধ হলেও (যদিও সাধু-সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন উপায়ে গাঁজা জোগাড় করছে এবং খাচ্ছে) কেবলমাত্র রপ্তানির জন্য গাঁজা চাষের বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। অনেকটা এক্সক্লুসিভ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের মত।(শেষ)

(অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আহ্বায়ক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, সাবেক উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর