১৫ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, সকাল ১১:৫৫
নোটিশ :
Wellcome to our website...

“স্বাগতম বঙ্গাব্দ- ১৪৩০” পয়লা বৈশাখ বাঙালির সুখ দুঃখের কথা কয়

মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব ।। ভার্সিটি নিউজ
বুধবার, ১৫ মে ২০২৪, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

এক) কাল থেকে কালের পরিক্রমায় বঙ্গাব্দ ১৪২৯ কে বিদায় দিয়ে আমরা আর ক’দিন পর ১৪৩০ কে বরণ করতে যাচ্ছি। এই বঙ্গাব্দের সামগ্রিক কালভিত্তিক দেহের প্রথম যে অঙ্গটি উঠে আসে, তাহলো বৈশাখ। অতিমারি কোভিড-১৯ এর কারণে বিগত দু’বছর পয়লা বৈশাখ পালন করা সম্ভব হয়নি। এবার এর প্রকোপ কমে আসায় কিছুটা হলেও আমরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। যাহোক, এই বৈশাখ নিয়ে কত যে কথা, কত যে খরা ও বৃষ্টি ভেজা সুখ দুঃখের অনিন্দ সুন্দর আনন্দের হিল্লোলের আবেগপ্রসূত বাসরের বলা ও না বলা কাহিনী। আসলে নক্ষত্রের নাম অনুযায়ী রূপান্তরপূর্বক অপভ্রংশ হয়ে “বৈশাখ” শব্দটি এসেছে। বৈশাখ আমাদের হৃদয়ের অঙ্গীকারের মাস। হাসি কান্নার আবর্তে ঝড়ে মন শক্ত হবার মহড়ার মাস। আর হলো সৃষ্টির রুদ্র লগন ও দামাল ছেলেদের কাঁচা মিঠা আমের মাস এবং মধু মাস জ্যৈষ্ঠের আগমনী সারথী। কিন্তু এ বৈশাখ তথা বাংলা মাসের পিছনে কিছু জানা ও অজানা ইতিকথা আছে, যা বাঙ্গালী হিসেবে জানা একান্ত আবশ্যক। কেননা এটা মোদের মনন, চিন্তন, আত্মা ও জীবনের সাথে সম্পৃক্ত, যা আলাদা করলে বাঙ্গালী কলেবর নিষপ্রাণ হয়ে পড়ে। যাহোক, স্মরণকালের অতিপ্রাচীন সেই সব নববর্ষের দিকে যদি ফিরে তাকাই, তাহলে মনের বাতায়নে উদ্ভাসিত হয় যে, আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ব্যাবিলনে নববর্ষ উদযাপিত হতো, যার স্থায়িত্ব ছিল একটানা এগারো দিন। তাছাড়া পারস্যে নওরোজ নববর্ষ উৎসব কম প্রাচীন নয়। উল্লেখ্য যে, এর আগে আরবী ভাষা ভাষিরা মুহাররমের প্রথম দিন নওরোজ হিসেবে নববর্ষ পালন করতো, যা অন্তর দিয়ে এখন পর্যন্ত পারস্যবাসীরা ধরে রেখেছে। এদিকে জেদি জাত পাঞ্জাবীরা (শিখ) ১ লা বৈশাখের উপর অতীব গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রাচীন ভারতবর্ষে যে কয়টি অব্দ (সন) প্রচলিত ছিল, তার মধ্যে উল্লখযোগ্য হলো হর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বল্লাব্দ ও গুপ্তাব্দ। এ সকল অব্দই সৌর বৎসর ভিত্তিক। তবে সুদূর অতীত থেকে ভারতীয় বর্ষপঞ্জি যে ২(দুটি) মৌলিক বিধি মেনে চলছে, তা হলো প্রথমতঃ ফসলি, ধর্মীয় (সনাতনী) ও খাজনা আদায় সংক্রান্ত (এটি যেন ঋতুর নকিব) দ্বিতীয়তঃ যে কথাটি আসে, তাহলো ঋতুর আওতাধীন অনুষ্ঠানের দিন পল, লগন, প্রহর এবং তিথি দ্বারা স্থিরকৃত। এ মাসে গড়ে তাপমাত্রা ৩০০-৩৫০ সেলসিয়াস বিরাজ করে এবং বাতাসে প্রচুর জলীয় পদার্থ থাকে, যা চৈতি খরায় তেমন থাকে না। এদিকে এ মাসটি ইংরেজী এপ্রিল ও মে মাসের মধ্যে বিস্তৃত।

দুই) যাহোক, প্রাচীনকাল থেকে এ অবনীতে সময় গণনা মানুষের একটি সহৃজাত প্রবৃত্তি, যা ধীরে ধীরে বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা সময়ে একক হিসেবে প্রবির্তত হয়েছে। এ বিশ্বে গোষ্ঠি ভিত্তিক অসংখ্য সন ও তারিখ আছে, তন্মধ্যে সচারচর হাতে গুনা কয়েকটি আমরা জানি। উল্লেখ্য যে, প্রাচীন শকাব্দ সনের পথ ধরে প্রবর্তিত হয়েছে সম্বৎ, মঘী, নেপাল, ত্রিপুরাব্দ, লক্ষন, পরগণাতি, শাহুর, হিজরি, ঈসায়ী বা খৃষ্টীয়, বঙ্গাব্দ, জালালী সন, ইত্যাদি। এর কোন কোনটা সৌরবর্ষে, আবার কোন কোনটা চান্দ্রবর্ষে গণনা করা হয়ে থাকে। একটু গভীরে যদি যাই, তাহলে দেখি চতুর্থ মাত্রা হিসেবে সময় আছে বলে গতি আছে এবং নিউটনের সূত্রের আওতায় যোগ হয়েছে বস্তু সত্য কথা বলতে কি, সময় না থাকলে সবকিছু অচল তথা সীমাহীন ওজন নিয়ে চিরস্থির থাকতো। তখন বিশ্বব্রমান্ডে কোন কিছু থাকতো না। এ বিষয়ে সময়ের ইতিহাস সম্পর্কে  বলতে গিয়ে প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক ডব্লিউ হকিংস কৃষ্ণ গহ্ববের আলোকে অনেক কিছুর অবতারনা করেছেন। অবশ্য ইসলামী দশর্ণের আলোকে সময় গণনার পেছনে যে, শাশ্বত কথাটি কাজ করেছে, তার সুত্রপাত হয়েছে পবিত্র কালামে, কেননা আল্লাহতালা বিশ্বজনীন ভাবে ঘোষণা দিয়েছেন “আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম  দিন থেকেই বছর গণনার মাস হবে বারটি”। যাহোক, ক্রম আবর্তিত শর্তের ভিত্তিতে এটাই প্রমাণ করে, প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখী ফসল ও ধর্মীয় (বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে) মাস হিসেবে এ দেশের মানুষের আত্মার সাথে মিশে আছে এবং সরল ও সোজা বাঙ্গালীরা কায় মন বাক্যে এ সময়টুকু নিয়ে কত কিছু না ভাবে, আর কতই না স্বপ্নের আতিশয্যে বিভোর থাকে?

তিন) মূলত সনাতনীরা বাংলা সনকে যতটা গুরুত্ব দেন, মুসলিমরা ততটা নয়। যদিও বাংলা সনটির উৎপত্তি হিজরি সাল থেকে। এ দিকে সন এবং সাল শব্দ যথাক্রমে আরবী ও ফারসি শব্দ থেকে এসেছে। উল্লেখ্য, ১২০১ খৃষ্টাব্দে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন খিলজী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করলে হিজরি সাল রাষ্ট্রীয় সাল হিসেবে প্রচলিত হয়। উল্লেখ্য যে, তখন রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে হিজরি সালকে গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এতে কৃষানদের উপর ক্লেশকর ও যন্ত্রদায়ক অবস্থার সৃষ্টি করে। কেননা চান্দ্র এবং সৌর বর্ষের মধ্যে ব্যবধান স্বরূপ প্রতি বছর ১১/১২ দিন এগিয়ে আসার কারণে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। কেননা হিজরি সালের ১২ মাস সৌর ৩৬ বছরে একটি চক্র রচনা করে। যাহোক, চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী খাজনা (ভূমি কর) আদায়ে সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকে। কেননা ফসল কাটার সময় হলো সৌর বছরের অন্যতম শাশ্বত বাস্তবভিত্তিক প্রতিফল। এ জটিল বিষয়টি বিচক্ষণ মহামতি বাদশা আকবর অনুভব করেন এবং তা সুরাহা করার লক্ষ্যে তিনি হিজরি সালের (মহরম প্রথম মাস) পবিত্রতা রক্ষাকরণপূর্বক জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ও অংকশাস্ত্রবিদ আমির ফতেহুল্লাহ্ সিরাজীকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেন। [উল্লেখ্য যে, তাঁর নাম অনুসারে ঢাকার রাজধানী অদূরে ফতুল্লাহ নাম হয়েছে]। জনাব সিরাজী বিশাল মোঘল সাম্রাজ্যের নানা স্থান পরিভ্রমনপূর্বক বিভিন্ন আঙ্গিকে পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করতঃ বাদশা আকবরের মসনদে আরোহনের ৯৬৩ হিজরি সনকে বিবেচনায় এনে প্রস্তাবিত বছরের ক্ষেত্রে ৩৫৪ দিন গণনার পরিবর্তে ৩৬৫ দিনের উপর জোর দেন। বিচক্ষণ বাদশা আকবর সভাসদসহ (নবরত্ব) ফতেপুুর সিক্রিতে রাজ সভায় বেশ কয়েক দফায় পর্যালোচনা করতঃ সবই ঠিক রাখেন। কেবল ঋতুর সাথে সম্পৃক্ততা রেখে গণনার নির্দেশ দেন এবং তদানুযায়ী বাংলা সনের সূচনা। উল্লেখ্য যে, এ দিন ছিল হিজরি ২রা রবিউসসানি, রোজ শুক্রবার, ইংরেজি ১৪ই এপ্রিল, ১৫৫৬ইং সাল। আর তখন থেকেই প্রকারান্তরে পয়লা বৈশাখের পদচারণা শুরু। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মিথিলা (বর্তমান বিহার) ভাষায় এক সন থেকে আরেক সন বের করার পন্থা উল্লেখ পূর্বক দু’চরণের সুন্দর একটি ছড়া জন মুখে শ্রুতি হিসেবে বিদ্যমান :

অর্থাৎ শক সন থেকে ‘বাণ= ৫, ‘শশি = ১, ‘বান= ৫; এ তিনটি অংক মিলে দাঁড়ায় ৫১৫ এবং শক সন থেকে ৫১৫ বাদ দিলে বাংলা সন পাওয়া যায়। এদিকে চৈত্র মাসের শেষ দিনে (চৈত্র সংক্রান্তি) তৎকালীন জমিদার, তালুকদার, জোতদার ও সংশ্লিষ্ট অন্যানরা খাজনাসহ ব্যবসায়ীদের বকেয়া আদায়ে গুরুত্ব পায় এবং পয়লা বৈশাখে ভূ স্বামী ও ব্যবসায়ীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন, পূণ্যাহ পালন ও হালখাতা  (লাল মলাটে বাঁধা) খুলতেন, যা পরবর্তী সময়ে উৎসবে রূপ নেয়। তাছাড়া এটি পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় জীবনে বয়ে আনে হিল্লোল ও এক আনন্দঘন পরিবেশ ভিত্তিক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ইদানিং নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকায় ছোট বড় ধারায় উচ্ছল জনস্রোতের সৃষ্টি হয়, যা জাতীয় অনিবর্চনীয় অধিবন্ধন বললে বেশি বলা হবে না। এদিকে ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। উল্লেখ্য যে, ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫ইং সাল) ছায়ানটের উদ্যোগে প্রথম এ উৎসব শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সেই চিরচেনা ঐতিহাসিক বকুলতলায়, যা এখনও প্রতি ১লা বৈশাখে প্রভাতী অনুষ্ঠানে নববর্ষকে সাদরে সম্ভাষণ জানানো হয়ে থাকে।

চার) উল্লেখ্য, বঙ্গাব্দ নিয়ে কিছুটা জটিলতা পোহাতে হয় বিধায় ষাট দশকে বাংলা সন নিয়ে (১৯৬৩ সালে) বাংলা একাডেমী কর্তৃক বাংলা সাল সংস্কারের লক্ষ্যে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাকে সভাপতি করে “বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার পর্ষদ” গঠনপূর্বক এর উপর গুরু দায়িত্ব দেয়া হয়। উক্ত কমিটি বাংলার প্রাকৃতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জনপদে সময়ের আবর্তে সংঘটিত মিথস্ক্রিয়ার আলোকে চান্দ্র এবং সৌর সাল সহ পূর্বের কিছু সূ² বিষয় বিবেচনায় এনে ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ সালে (৫ই ফাল্গুন ১৩৭২ সন) উক্ত পর্ষদ চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন। তাঁরা আকবরী সালের পক্ষে পুরোপুরি মত দেন। তবে মাসগুলোর সময় যাতে নির্দিষ্ট থাকে, সেই ব্যাপারে বৈশাখ হতে ভাদ্র পর্যন্ত ৩১ দিন করে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন হিসেবে এবং অধিবর্ষের জন্য মাধবী চৈত্র মাসকে (৩০+১)= ৩১ দিনের আওতায় আনা হয়। বাংলা পঞ্জিকা দু’বাংলায় একদিন আগ পাছের আওতায় কিছুটা ভিন্নতর হলেও, বাংলাদেশের পঞ্জিকা বিভিন্ন আঙ্গিকে সংশোধনের পর অধুনা একটি সর্বজন স্বীকৃত রূপ লাভ করেছে। এ ক্ষেত্রে কথা প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যে সারে সাত শো কোটির বিশ্বে স্ব স্ব জাতির যত নববর্ষ পালিত হয় তন্মধ্যে ইংরেজী সালের ১লা জানুয়ারি সর্বজনবিদিত ও বহুল প্রচারিত [জানা যায় যে, দু’মুখ সম্বলিত রোমান দেবতা জানুসের নাম থেকে এসেছে জানুয়ারি মাস। তিনি ছিলেন স্বর্গের পাহারাদার, তার একটি মুখ ছিল জরাজীর্ণ, পুরাতন এবং অপরটি ছিল নব, সুন্দর মনোরম ও লাবণ্যময়। তাই এর সূত্র ধরে পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করে নেয়ার রীতি প্রচলিত হয়েছে।] এ প্রসঙ্গে পারস্যের (ইরান) বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ফারভারদীনের প্রথম দিন নওরোজের কথা স্বভাবতই এসে যায়। ইরানীরা খুবই আন্তরিকভাবে এই নববর্ষ পালন করে থাকে। কেননা এদিনটি নাকি প্রকৃতির নতুন রূপের জন্মদান এবং নবযাত্রার সারথী। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, “স্বয়ং আল্লাহতায়ালা এ দিনে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মান্ডÐ সৃষ্টি করেন এবং এই দিনেই নাকি প্রথম মানবের (আদম/মনু) আর্বিভাব ঘটে।”

পাঁচ) মজার ব্যাপার হলো, আমরা যে ৭ দিনে সপ্তাহে  দেখি। পূর্বে কিন্তু সেরকম ছিল না। চৈনিক ভাষার মতো এলাকা ভিত্তিক অগনিত শব্দ চয়নের ন্যায় প্রতিদিনের একটি স্বতন্ত্র নাম ছিল। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে নামেরও ভিন্নতা ছিল, যা মনে রাখা ও হিসাব রাখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। তাই দাদা বাদশাহ আকবরের সুন্দররের পুজারী আদরের নাতি বাদশাহ শাহজাহান (ক্ষুররম) এগিয়ে আসেন। তিনি একজন পুর্তগীজ পন্ডিতের সহায়তায় একই ধরনের (প্রমিত) নামে সাত দিনের সমন্বয়ে সপ্তাহ পদ্ধতি প্রবর্তন পূর্বক ৫২ সপ্তাহে বছর ধরেন। অবশ্য এ ব্যাপারে রোমান ও ইংলিশ প্রপঞ্চের উপর গুরুত্ব দেন।

 

ছয়) আমরা জানি, সময়ের আলোকে ব্যাপ্তি গণনার ক্ষেত্রে রবিশশীর চলমান গতির বিকল্প নেই। যাহোক, এ দুটি যথাক্রমে নক্ষত্র ও উপগ্রহের গতিবিধি ধরে সূর্য ও চন্দ্রের গতিপথ সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। তাই প্রাচীনকাল থেকেই সূর্যের চারিদিকে আমাদের এই সাধের পৃথিবীর পরিভ্রমণসহ ভারতীয় সাধু ও জ্যোর্তিবিদরা চান্দ্রপথকে ২৭ ভাগে ভাগ করেন (উল্লেখ্য যে এই ভারতের মহামতি আর্যভট্ট শূন্য আবিস্কার করেন)। প্রকাশ থাকে যে, উক্ত প্রতিটি অংশ এক একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। সাধারণতঃ পূর্ণিমার পরদিন (প্রতিপদ) থেকে চান্দ্র মাসের সূচনা। মূলতঃ মহাবিশ্বের অমোঘ ধারায় প্রত্যেক প্রতিপদে চন্দ্রের পার্শ্বে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র বিরাজ করে এবং এটির প্রমিত মান (ঘড়ৎস) ধরে প্রতিপদের পরদিন (দ্বিতীয়া) চন্দ্রের পার্শ্বে যে নক্ষত্র অবস্থান নেয়, ঐ মাস সেই নক্ষত্রের নাম অনুসারে (শুধু অগ্রহায়ণ বাদে) নামকরণ করা হয়। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে মাসগুলোর আরবি/ফারসি শব্দের সুবাদে নাম ছিল ১) ফারওয়ারদিন, ২) উর্দিবাহিশ, ৩) খোরদাদ, ৪) তীর, ৫) মুরদাদ, ৬) শাহারিবার, ৭) মেহের, ৮) আবান, ৯) আজার, ১০) দে, ১১) বাহমান এবং ১২) ইসফান্দ। পরবর্তীতে যোগ বিয়োগ করতঃ এই বাংলা মাসের নামগুলো প্রায় সবগুলো নক্ষত্রের নাম হতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা নিম্নোক্ত সারণিতে বর্নিত বিন্যাস সদয় অবলোকন করা যেতে পারে।

সাত) যদিও নববর্ষ নিয়ে আলোচনা করছি, তথাপিও প্রাসঙ্গিক কারণেই বাংলাদেশের অর্থ বছরের উপর কিছুটা গভীরে আলোকপাত করা আবশ্যক বলে মনে করি। বাংলা নববর্ষ বৈশাখ হলেও, আমাদের চলমান অর্থনীতির কর্মকান্ডের সারথী প্রচলিত অর্থ বছর (জুলাই জুন) হিসেবে যদি মিলিয়ে দেখি, তাহলে দেখা যায় আমাদের অর্থবছর তৎকালীন পাকিস্তানের কাছ থেকে উত্তারাধিকার সূত্রে পাওয়া, যার সাথে বাস্তব প্রেক্ষাপটের খুব একটা মিল নেই। এ অর্থ বছরের ধারক ও বাহক অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, এজি অফিস, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অফিসসহ অভিভাবক মন্ত্রণালয়ে সদা ব্যস্ত থাকে। নিম্নোক্ত সারণিতে বর্ণিত বিশ্বের সকল দেশগুলো তাদের ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়া, জিডিপির ভিত্তি, উদ্ভিদ পরিসর, এবং কাম্য রাজস্ব আদায়ের ফলিত সময় বিবেচনায় এনে অর্থ বছর শুরু করেছে, যা সকলের জানা বিধেয় বলে মনে করি।

আট) আমরা জানি, আমাদের অর্থবছর চার কোয়ার্টারে বিভক্ত। প্রথম কোয়ার্টার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর (বৃষ্টি ও বন্যার মাস); দ্বিতীয় কোয়ার্টার অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর (হেমন্ত ও শীতের মাস); তৃতীয় কোয়ার্টার জানুয়ারি থেকে মার্চ (শীত বিদায় ও বসন্তের মাস); চতুর্থ কোয়ার্টার এপ্রিল থেকে জুন (কাল বৈশাখী ও অঝোর ধারায় বৃষ্টির মাস)। এতে প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃতির খেয়ালী আবহাওয়া হলেও ৩য় কোয়ার্টারের জন্য নির্ধারিত সময়ে মূলধনী কাজের তথা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত সময়। কিন্তু নানা কারণে বাংলাদেশে অর্থবছরের ক্রান্তিতে তথা শেষ কোয়ার্টারের সময়ে উন্নয়নমূলক কাজের উপর বেশি জোর দেয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। যদিও তখন এদেশে চলে বৃষ্টি আর বন্যার আনাগোনা এবং অধিকাংশ এলাকা ধরে জল থৈ থৈ করে। ফলশ্রুতিতে গতিশীলতায় কিছুটা শ্লথ নেমে আসে। এদিকে অনেকাংশে বিদেশী নির্ভরশীল অর্থনীতির কারণে সাধারণত প্রতি অর্থবছরে কিস্তির অধিকাংশ টাকা সঙ্গত কারনেই মে এবং জুন মাস পাওয়া যায় এবং এ সূত্র ধরে প্রতিশ্রুতি বকেয়ার টাকা সাধারণত বছরান্তে প্রায় তিন কিস্তির টাকা একবারে পাওয়ার কারণে তড়িঘড়ি করে কাজ করতে হয়। এদিকে ভৌত কাঠামো কাম্য পর্যায়ে দেখাতে না পারলে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে এবং টাকা ফেরৎ দিতে হবে। এতে নেতিবাচক দিকটাই প্রকট হয়ে উঠে। তাছাড়া আমাদের দেশে জাতীয় বাজেট মে মাসের মধ্যে সবকিছু সম্পাদন করে সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং জুন মাসের দিকে অনুমোদন পেয়ে থাকে। অথচ তখন চলে এ দেশে পুরোদমে বর্ষা মওসুম। এতদ্ব্যতীত তখন অর্থ ছাড়করণের ব্যাপারে বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ উদ্ভুত ঝামেলা পোহাতে হয়। অনেকে মনে করেন যে, বাংলা বছর অনুযায়ী আর্থিক বছর চালু করলে হয়তোবা কিছুটা সুফল পাওয়া যেতো। কথাটা পুরোপুরি না হলেও কিছুটা সত্য। তাই এতদপ্রেক্ষাপটে উন্নয়ন তরান্বিত হওয়ার বিষয় উড়িয়ে দেয়া যায় না। যদিও এক্ষেত্রে অনেকে দাতাগোষ্ঠির প্রতিশ্রুতি তথা বৈঠকের দোহাই দিয়ে থাকেন। মূলত আমাদের দেশ কৃষি নির্ভরশীল অর্থনীতির বাজেটে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য অংশ হলেও দেশীয় উৎসকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বাস্তবে দেখা যায়, ফসল কৃষাণের বাড়িতে ওঠে দুটি সময়ে, যেমন রবি শষ্য (চৈতালী) ফাল্গুন ও চৈত্র (মার্চ এপ্রিল) মাসে এবং প্রধান ফসল আমন (নবান্ন উৎসবের আওতায়) কার্তিক অগ্রহায়ন (অক্টোবর নভেম্বর)। আর এই সময় কর ও অভিকর আদায়ের মোক্ষম সময়। উল্লেখ্য, আমাদের সাথে সর্বদিক থেকে মিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে অর্থ বছর এপ্রিল থেকে শুরু। তাছাড়া বাংলাদেশের বর্ডার ঘেঁষে ভারতের রাজ্যগুলোর (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি) বলতে গেলে প্রকৃতি ও আবহাওয়া কমবেশী একই রকম। কেননা তাদের সূত্র ধরে প্রধান ফসলের মাস কার্তিক অগ্রহায়ণ বিধায় সেটি সামনে রেখে আমাদের অর্থবছর জানুয়ারি ডিসেম্বর হওয়া অধিকতর যৌক্তিক।

নয়) যাহোক, অত্র প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়ে ফিরে আসি, বাংলা নববর্ষের “পয়লা বৈশাখ” এখন শহর, বন্দর, গ্রামগঞ্জে জাতি বর্ণ নির্বিশেষে আবাল বৃদ্ধবণিতার হৃদয় নিংড়ানো উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটা মহাখুশির দিন। এই দিবসে বৈশাখী মেলা বসে দেশের বিভিন্ন স্থানে। উক্ত মেলায় বিভিন্ন দ্রব্যাদি বিশেষ করে হাতের তৈরি কুটির শিল্পের নানা জিনিস, যেমন চেয়ার, টেবিল, চৌপায়া, ব্যালন, পিঁড়ি, রেহেল, লাঠি, ইঁদুর ধরার ফাঁদ, কুলা, নারিকেল কুড়ানি, পুতুল, গাঁইল, চেগাইট, খড়ম, বাঁশের বাশী, পাউডি, ডাল ঘুটনি, ঘুড়ির নাটাই, মাটির তৈরি রকমারি জিনিস, খেলনা, মুড়ি, মন্ডা, মিঠাই, জিলাপি, বাতাসা, তিলের খাজা, তেজপাতা, ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, নববর্ষে সংগৃহিত আতপ চাউল ও তন্ডুল [এক ধরনের চাল, আঁখের নতুন গুড়, নারকেল ইত্যাদির সমন্বয়ে তৈরী] দিয়ে সেকালে নবান্নের আয়োজন করা হতো। বর্তমানে কিছুটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অবশ্য এখন বিরানী, তেহারী, চিতাই, পাক্কান, তিরো, তালের ভাঁপা, পাটি সাপটা, পোয়া পিঠা বড় আকর্ষণ। এ ছাড়া শিশু কিশোরদের দেশী বিদেশী খেলনা, মহিলাদের সাজসজ্জার জিনিসপত্র সহ বিভিন্ন বাঙ্গালী খাদ্যদ্রব্য যেমন চিড়া, দই, মুড়ি, খৈ, তিলের খাজা, বাতাসা, ঝুরি, সাঁচ, ইত্যাদি লোকজ খাদ্যের বর্হিপ্রকাশ। এদিকে নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে বড় লাল টিপ পরে। আর ছেলেরা পরে  বিশেষ ধরনের রং  বেরংয়ের পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। তাছাড়া সনাতনীদের কেউ কেউ ধুতি পাঞ্জাবিও পরে থাকে। অধুনা তরুন তরুণীরা মুখে ও হাতে উলকি তোলা রংঙের বৈশাখী আলপনা একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলি কোন কোনটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীন ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে। আর এ ধারায় গ্রাম ও শহরের সংস্কৃতির আবহাওয়া একই ভাবে বইতে শুরু করেছে। সেই সূত্রধরে কিছুটা আধুনিক কলেবরে আজও আমরা ঘরে ঘরে নতুন খাবারের আয়োজন করে থাকি। অবশ্য ইদানিং যোগ হয়েছে সকাল বেলায় পানতা ভাত খাওয়া এবং সাথে থাকে সরষে ইলিশ মাছ। আর এখন এমন হয়েছে যে ইলিশ ছাড়া যেন বাংলা নববর্ষ চলেই না। এখন পান্তা ইলিশ নববর্ষের অন্যতম উপাদান। এক্ষত্রে পান্তা ইলিশের শানে নুযুল সম্মানিত পাঠকবর্গের জানা দরকার বলে মনে করি। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ যে, ১৯৮৩ সালে চৈত্রের শেষে যখন রমনা বটমূলে বৈশাখ বরণের আয়োজন চলছিল। তখন কয়েকজন আড্ডা দিতে দিতে পান্তা পেঁয়াজ কাঁচা মরিচের কথা তোলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বটমূলে পান্তা ইলিশ চালুর প্রস্তাব দেন। তখন এ প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এ সূত্র ধরে নিজেদের মধ্যে পাঁচ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। রাতে ভাত রেঁধে পান্তা তৈরিপূর্বক কাঁচা মরিচ, শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ এবং ইলিশ ভাজাসহ ভোরে তাঁরা হাজির হন রমনা রেস্টুরেন্টের সামনে। সঙ্গে মাটির সানকিও ছিল। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায় পান্তা ইলিশ। সেই থেকে বর্ষবরণের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক পান্তা ইলিশের পদচারণ শুরু হয়। এখন তা রেওয়াজ হয়ে পহেলা বৈশাখের পার্ট এন্ড পার্সেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এখন মোঘলাই খাবার, ফুসকা, বিরানী, চটপটি, রেজালা, জর্দা, রোস্ট, বোরহানী ও ফাস্টফুডের  অণুপ্রবেশ খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

দশ) পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে খেলাধুলারও গুরুত্ব কম নয় যেমন কড়ি, ডাংগুলি, বলী, লাঠি, হা ডু ডু ইত্যাদি খেলা। তাছাড়া চৈত্র সংক্রান্তি তথা বছরের শেষ দিনও হৃদয়ের সাথে গাঁথা। কেননা এই দিনে ধুয়ে মুছে, ঋণমুক্ত হওয়ার দিন। এদিকে হালখাতা, বীজ বপন, চড়ক পূজা, গনেশ পূজা, গাজন মেলা, সত্য পীরের গান, কেষ্টগান, পুতুল নাচ, সার্কাস, নগরদোলা, মোরগ ও ষাঁড়ের লড়াই, যাত্রাপালা, জারিগান, গম্ভিরা গান, কবিগান, কবিতার আসর, ইত্যাদিতে সারা বাংলায় খুশি ও মননশীলতার হিল্লোল বয়ে যায়। তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ গায়ক ও নর্তক নর্তকীদের উপস্থিতি থাকে। একই সাথে লাইলী মজনু, ইউসুফ জুলেখা, রাধাকৃষ্ণ, রূপবান সিরাজ উদ দৌলা প্রভৃতির উপখ্যান উপস্থাপিত হয়ে থাকে। চলচ্চিত্র নাটক, সার্কাস, ব্যান্ড শো, ইত্যাদি মেলার অনন্য বিশেষ আকর্ষণ। আর ইদানিং যোগ হয়েছে গতিময় রঙিন লাইটিং. যা সহজে সবাইকে আকর্ষণ করে থাকে।

এগারো) পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, গ্রাম বাংলা ছাড়াও শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈশাখী মেলা বাংলাদেশের যেসব স্থানে বসে, সেসবের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো: নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গাকোট, চাপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ টাংগাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি বাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গিপাড়া, মুজিবনগর এলাকা, পাবনার খাঁপুরা (নগর বাড়ীর দক্ষিনে) ইত্যাদি। এদিকে ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, টঙ্গীর স্নানকাটা মেলা, মিরপুর দিগাও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা, ভাগ্যকুল মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুরের ফুলতলী, রানীশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবের রূপ নিয়েছে। কালের ও মানসিকতার বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে। আবার সংযোগও ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। উল্লেখ্য যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যাহ উৎসরেব বিলুপ্তি ঘটে। তখন পয়লা বৈশাখ ছিল জমিদারদের সাধের পুণ্যাহের দিন। এদিকে ঢাকার  ঘুরি ওড়ানো এবং মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড় ও মোরগ লড়াই প্রতিযোগিতা ছিল এক সময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। একই সাথে লাঠি খেলা ও নৌকা বাইচ কেমন যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রামের বলিখেলা এবং রাজশাহীর গম্ভীরা অতীব উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে অনুষ্ঠিত হয়। এদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গন, টি.এস.সি এবং চারুকলাসহ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্র। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে নজরুল ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের, ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক), নজরুল একাডেমী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইষ্টিটিডট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। সেসব কর্মসূচিতে থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, কবিতার আসর, বর্ণাঢ্য মিছিল, লোকজ বৈশাখী মেলা, ইত্যাদি। বাস্তবে যা দেখেছি, তাতে প্রতীয়মান হয়েছে যে বাংলা একাডেমী এক্ষেত্রে মুরুব্বীর ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো পয়লা বৈশাখের ওপর বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে। এছাড়া সংবাপত্রগুলিতে বঙ্গাব্দ, নববর্ষ ও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধসহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়।

বার) এদিকে বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পার্বত্য এলাকায় যেমন রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ইত্যাদিতে উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয়। এতে সামাজিকীকরণের পথ সুগম করে বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব হিসেবে ‘বিজু’ পালিত হয়। পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়ীরা তিনদিন ব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসবের বরাতে পাহাড়ীদের বিভিন্ন খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসীরা বিশেষ মেলার আয়োজন করে থাকে।

তের) এখানে একটি কথা না বললেই নয় যে, বর্তমান বিশ্বে যত প্রাচীন উৎসব আছে, সকল উৎসবেই দেখা যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গোষ্ঠির দর্শনের আওতায় ধর্ম ভিত্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের সকল গোষ্ঠি পেরিয়ে একমাত্র পয়লা বৈশাখে ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও বয়স নির্বিশেষ একসাথে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে। তাছাড়া সুদূর অতীত হতে আজ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় যে, বছরে যত উৎসব হয়, তার মধ্যে একমাত্র বৈশাখী উৎসবই বেশি তাৎপর্য বহন করে, যা লোকজ উৎসব হিসেবে পরিগণিত। রবি ঠাকুরের সেই শাশ্বত কবিতা (“ঐ কেতনের…তোরা সব জয়ধ্বনি কর”) সদামনে পড়ে, যা বৈশাখী কর্মকান্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উল্লেখ্য, বৈশাখ আমাদের জীবনে বিভিন্ন মাধুরী নিয়ে নব নব সারথীতে উদ্ভাসিত হলেও নেতিবাচক দিকটা কম নয়। বাংলাদেশের পশ্চিম উত্তর দিকে সমুদ্র বেষ্টিত উড়িষ্যার আকাশে কালমেঘ উদ্ভবপূর্বক ঘনীভূত হয়ে সারা বাংলাদেশের উপর কাল বৈশাখী অপরাহ্নে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। এতে বজ্রপাতসহ ঝড়ের তান্ডবে ধ্বংস শাধিত হলেও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থানের প্রেক্ষাপটে মৌসুমী ভিত্তিক আবহাওয়ার কারণে যে প্রচুর বৃষ্টি হয়ে থাকে, সেই সুবাদে আউশ ও আমন ধান বোনার পথ সুগম করে থাকে। তাছাড়া সারাদেশে খা খা রোদের তীব্রতায় কৃষান কৃষানি নাভিশ্বাস হয়ে উঠলেও বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি হওয়ার কারণে জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসে এবং তার উল্টা পিঠেই আবার অনাগত ভবিষ্যতের আশে দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা সদৃশ ফসলের হাসির রেশ ফুটে উঠে।

চৌদ্দ) পুনরায় সম্মানিত পাঠকদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষন করছি যে,পয়লা বৈশাখ প্রাণের হিল্লোল, আবেগ, ঐতিহ্য ভরা নববর্ষের প্রথম দিন। এই দিনে প্রায় বাঙ্গালীর জেনেটিকের সূত্র ধরে মস্তিস্কের আবেগময় অংশ খুবই আলোড়িত হয় এবং এক ধরনের হরমন এর ইতি নেতিবাচক খেলায় এই বিশেষ দিনের ২৪ ঘন্টার ৮৬৪০০ মুহূর্তই নিরবিচ্ছন্ন চঞ্চলা হৃদয়ের আবেগময় আনন্দের সায়েরে নিমজ্জিত থাকে। উল্লেখ্য বয়স ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের উৎসব বাংলা ‘নববর্ষ’। বৈচিত্রময় ষড় ঋতুর এই দেশ গ্রীষ্মকালের শুরুতে পয়লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত, স্বশিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, অশিক্ষিত, নিরক্ষর, ধনী গরীব সব শ্রেনীর এবং বিভিন্ন পেশার মানুষগুলো কনক আবেগময় আনন্দের আতিশয্যে আপ্লুত হয়। উল্লেখ্য যে, বাঙ্গালীদের মিলনের উৎসব পয়লা বৈশাখ এবং এটি তাদের একটি সার্বজনীন লোকজ উৎসব। এ দিনটিতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। ভারতে বৈশাখী উৎসব সব জায়গায় তেমন সমাদৃত না হলেও পাঞ্জাব ও পশ্চিম বঙ্গের কোলকাতার নাগরিকরা ৩৬৫ দিন ধরে এই ১ লা বৈশাখী উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। এদিকে “বহাগ বিহু” নামে আসামে, “পুঠান্ডু” নামে তামিলনাড়–তে এবং “বিষু” নামে কেরালায় পালিত বৈশাখী উৎসব খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, শিখ পাঞ্জাবীদের নানকশাহী পঞ্জিকা অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন হিসেবে পালিত হয় এই রঙীলা উৎসবটি। কেননা পাঞ্জাবীদের কাছে এর ধর্মীয় পবিত্রতাসহ সামাজিক গুরুত্ব কতখানি, তা বলে শেষ করা যাবে না। কেননা ১৬৯৯ সালে আনন্দপুরের কেশগর সাহিব বৈশাখী মেলায় ধর্মগুরু নির্বাচনের প্রেক্ষাপটের মধ্যে দিয়ে পুরুষদের পদবী সিং (অর্থ সিংহ) এবং মহিলাদের পদবী “কাউর” (অর্থ রাজকন্যা) নির্ধারিত হয়, যাহা অদ্যবধি চলে আসছে।

পনের) সাধারনত বাঙালির সুখ দু:খের ভাগীদার ১লা বৈশাখ, যা হিজরি সালের রাত্র দিনের দর্শন ধরে আগের রাত্রে আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়ার কর্মকান্ড প্রাথমিকভাবে শুরু হয়। কেননা কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যাপিত হয় নববর্ষ। সরকারি বেসরকারি, অফিস আদালতসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ দিনে বন্ধ থাকে (অবশ্য দোকান পাঠ খোলা থাকে)। উল্লেখ্য, ২১ শে ফেব্রæয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলা সনের গুরুত্ব বেশ কয়েক গুন বাড়িয়ে তুলেছে। যেহেতু বাংলা সাল আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থ সামাজিক এবং জাতীয় পর্যায়ে লোহিত কনিকার সাথে মিশে গিয়েছে। সেহেতু পরিশেষে একটি উক্তি না করে পারছি না তা হলো, “বৈশাখ বাঙ্গালীর মনের কথা কয়” “বিধায় আসুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দকে মনের মাধুরী দিয়ে বরণ করি এবং যুগপৎ বিদায়ী ১৪২৯ বঙ্গাব্দের জন্য এক ফোটা অশ্রু ফেললও ফেলি”। তবে দুঃখ জাগে পশ্চিম বাংলার বাঙ্গালীদের জন্য। এককালে কোলকাতা সারা বাংলার সংস্কৃতির গ্রীনরুম থাকলেও, এখন ধীরে ধীরে হিন্দি সংস্কৃতি তাঁদের গড়া মননশীলতা ও মানসিকতাসহ সব কিছুর উপর কালছায়া ফেলে চলেছে। ইদানিং ভয় হয়, যে ভাবে আকাশ সংস্কৃতি ও মোবাইলের অপব্যবহার জেঁকে বসেছে। ভবিষতে হয়তোবা বাংলা ভাষাসহ বৈশাখী সংস্কৃতি কংকালসার হয়ে মসলিন কাপড়ের ন্যায় যাদুঘরে স্থান না পায়? আর একটি কথা না বললে কমতি থেকে যাবে, এক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের মধ্যে বাংলাবর্ষ নিয়ে একদিনের হেরফের আছে। বাংলাদেশের নববর্ষের পালনের পরের দিন পশ্চিম বঙ্গে নববর্ষ পালিত হয়, যা মোটেই ভাল দেখায় না। আর এ প্রশ্নের জবাবে ভার দু‘বাংলার মানুষের উপর ছেড়ে দিলাম।

 

সহায়ক সূত্রাদি :

০১। প্রবন্ধ মালঞ্চ, মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

০২। অত্র প্রবন্ধ প্রনেতা মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী রচিত “অর্থ বছর জানুয়ারি টু ডিসেম্বরের রূপরেখা ”, [বর্তমানে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগে বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।]

০৩। বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ- (নবপ্রথা-৫)

০৪। মাসিক কারেন্ট ওয়ার্ল্ড, এপ্রিল- ২০০৮ এবং মাসিক জিজ্ঞাসা, এপ্রিল- ২০১০।

০৫। সাপ্তাহিক ২০০০, এপ্রিল- ২০১০ এবং কারেণ্ট নিউজ. এপ্রিল- ২০১১।

০৬। লেখকের পঞ্চদশ বছরের অভিজ্ঞতা এবং সতীর্থদের সাথে আলোচনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর