৩রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, রাত ৩:৩০
নোটিশ :
Wellcome to our website...

ধর্মের সাথে মানুষের সম্পর্ক!

রিপোর্টার
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন



সুইটি রাণী বনিক

“দিন শেষে তো রাত আসবেই
চোখের জলেই হোক আর মনের সুখেই হোক,
রাতের প্রথম প্রহরে হোক, দ্বিতীয় প্রহরেই হোক, আর শেষ প্রহরেই হোক শান্তির ঘুমটাও অবশ্যই আসবে। “

মানুষের যাপিত জীবন শেষে একদিন অবধারিত মৃত্যু এসে তাকে জানান দেয়, তার আর সময় নেই। দুঃখের সাথে হোক আর সুখেই হোক মৃত্যুর চির শান্তি সে লাভ করে।

যদি মরেই যাব,
তবে কেন এত হিংসা -বিদ্বেষ, কেন এত ধর্ম নিয়ে মারামারি, কাটাকাটি, আমিত্ববোধে অহং মিশ্রিত দুরাচারী কার্যবিধি?
উপরে যিনি আছেন তিনি কিন্তু একজন, সংখ্যায় চার কিংবা তার অধিক নয়!
মানুষের মনে ভেদ, তাই তাদের ধর্মেও বিভেদ!
তাই তারা একে অপরকে ছোট করে, তুচ্ছ করে জোর পূর্বক ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ হয়। আসলে তাতে কি এমন ক্ষতি বা কি এমন লাভ হয়। মানুষের জন্যইতো ধর্ম, অমানুষের জন্য নয়।
প্রত্যেকটা মানুষের উচিত সকল ধর্ম সম্বন্ধে জানা, এবং প্রত্যেকটা ধর্মের মূল মাহাত্ম্য সম্পর্কে জানা।
রীতি-নীতি, আচার, কালচারে ভিন্নতা থাকলেও ধর্মে মূল মাহাত্ম্য কিন্তু এক! সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা, সকল জীবের প্রতি সদাচার করা, ঈশ্বরের কাছে সন্তুষ্টির জন্য ও তার কৃপা লাভের জন্য, তাকে নানা নামে জপ করা!!
উপরওয়ালাকে যে যে নামে ডাকে তার কাছে সে নামেই ধরা দেয়, তার কোন অহংকার নেই, অজ্ঞতা নেই- সকল সৃষ্টিই তার!
তবে আমাদের কেন
এতো ভেদ-বিভেদ, এত ধ্বংস-যজ্ঞ?
কেন- অতি ধর্মীকতা, অতি নিন্দা চর্চা, ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, আমিষ খাওয়া যাবে না, বিধর্মীদের নিজের ধর্মে আনা চাই, ওরা কাঁচা মাটি, ওরা পোড়া মাটি, ওরা নরকে যাবে, ওরা দোযখে যাবে, ওদের টাকা পয়সা দিয়ে নিজের ধর্মে আনো, ওদের আমাদের ধর্মে আনলে আমরা বেহেশতে যাব- এসব চিন্তা থেকে তখন অন্যধর্মীদের প্রতি ঘৃণা আসে, আবার ওদের যুবতী মেয়েদের দিকে বিশেষ নজরও থাকে। কেন এত লীলা। কে বলেছে, কোন ধর্মের প্রভু এই দুরাচার আদেশ দিয়েছে, আর তা কোন গ্রন্থে এসব লেখা আছে? তার কি কোন ব্যাখ্যা আদৌ কোন মানুষ দিতে পারবে।
তবে কেন সাম্য চিন্তা নাই মানুষের ভিতর?
আমরাতো মানুষই, অমানুষ তো নই। তবে কেন আমাদের কর্মে অমানুষের চিন্তা এসো ভিড় করে? ভেদ-বিভেদ এর সৃষ্টি করে। দেশ- জাতি-কাল,  আচার-অনুষ্ঠান ভেদে মানুষের চলাফেরা ও কাজে কর্মে ভিন্নতা আসতেই পারে!  তা নিয়ে কারো কোন পক্ষপাতিত্ব বা বিরোধ সৃষ্টি করে, আলোচনা-সমালোচনা, ছি ছি ছিটানো আসলে এসবে কি শান্তির কোন বার্তা বয়ে আনে কি?

কোন যুগে কোন মহাপুরুষ কি এসব বলে গিয়েছিলেন?
কখনোই এমন নয়। বলা হয়, যারা ন্যায়ের পথে চলে না, অনাচার-অবিচার করে, ঈশ্বরের প্রতি বা উপরওয়ালার প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস নেই, আনুগত্য নেই, সমাজে নিজেরসহ অন্যের ক্ষতি সাধন করে তাদের নৈতিক পথে আনার বার্তা প্রচার করতে!  আর তা হল মহান কাজ ও ধর্মের কাজ। অথচ প্রত্যেকটা ধর্মে দুই-চারটা করে মত ও পথের সৃষ্টি হয়েছে। কেউ ডানে নিতে চায়, কেউ বায়ে নিতে চায়! এই টানাটানিতে
কিছু মানুষ ডানে যায়, কিছু মানুষ বায়ে যায়, আর কিছু মানুষ ছিঁড়ে যায় (পথভ্রষ্ট হয়) ফলে  বা মূল ধর্ম থেকে অধিকাংশ মানুষ বাইরে থাকে। তারা কেবল লোকাচারে ধর্ম পালন করে, ধর্মের মূল মাহাত্ম্য বুঝতে তাদের গোড়ামি বা অজ্ঞতা রয়ে যায়। এ অবস্থায় বলা যায় যারা বিচার বুদ্ধি দিয়ে ধর্মের মাহাত্ম্য না বুঝে কেবল আচার পালন করে। আসলে তারা ধর্মকে আশ্রয় করে নিজেকে ধার্মিক হিসেবে জাহির করে, আর পরনিন্দা ও আমিত্বে অহংকার প্রকাশ করে।
আর যারা ধর্মের মাহাত্ম্য হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, চোখের জলে প্রভুর কাছে সরল সাবলীল ভাষায় নিজেকে আত্মসমর্পণ করে!  ঐশ্বরিক বিধি -বিধান নীরবে মেনে চলে, সর্বস্তরের মানুষকে ভালবেসে তাদের পাশে থাকে- সেটাই হচ্ছ প্রকৃত ধার্মিকতা!!  তারা বাকসংযমী, তারা ঐশ্বরিক বার্তা মনে ধারণ করে নিঃশব্দে, নিঃসন্দেহে নদীর স্রোতের মত বয়ে চলে এবং প্রভু তাদের প্রতি সু-নজর রাখেন সর্বদাই।
শুধু মন্ত্র কিংবা সুরাতে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করা যায় না, বরং তার অধিক হচ্ছে, জীবের কল্যাণে যে নিজকে সমস্ত জীবন নিয়োজিত করে প্রভুর কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা পালন করে, নিজকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে বরং তার পাশে চিরকাল ঈশ্বর থাকেন, বিপদে-আপদেও!

তবে কেন আমাদের ধর্ম নিয়ে বিরোধ-বৈষম্য? আমরা কি
সকলে মিলে সাম্য চিন্তা করতে পারি না? পৃথিবীর এই ক্রান্তি লগ্নে কেন ভাইরাসেরা মানুষের কানে কথা বলতে সাহস পায়?  কেন আমরা পরিস্কার পরিছন্ন থাকা যে ধর্মীয় রীতি তা ভুলে যাই? কেন আমরা বলি করোনা হলে শত্রুকে ছুঁয়ে দেই?  কেন আমরা ধর্মের অহংকার করি?
নিজ-ধর্মে থেকেও আমরা অন্যের ভাল রীতিনীতিগুলো ফলো করতে পারি। অন্যের উৎসবে আনন্দ করতে পারি এবং পারি নিজেদের সংস্কৃতিকে উপযুক্ত সম্মান করতে।

আমার যদি মানুষ হই তবে বলব শত্রুও যেন বিপথগামী না হয়, বিকৃত – মৃত্যু যেন না ঘটে। আমরা সকলের নিজ নিজ ধর্ম-সংস্কার বজায় রেখে, অন্যদের সাথে মানবীয় বন্ধন গড়ে তুলে সুন্দর সভ্যতা উপহার দিতে পারি।
আমরা মানুষ একই রক্তে-মাংসে গড়া- এই সহজ কথাটি যেন ভুলে না যাই। যুগে যুগে মহা সাধকরা বাণী প্রচার করে গেছেন তাদের নানা গ্রন্থে ও কথায়।  কবি নজরুল বলেছেন- ‘গাহি সাম্যের গান,
মানুষের চেয়ে নহে কিছু মহীয়ান।’
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-‘রেখেছ বাঙালি করে
মানুষ তো করোনি!’
‘সবারে বাসরে ভাল,
নয়তো মনের কালি ঘুচবে নারে!’
চণ্ডিদাস বলেছেন-‘সবার উপরে মানুষ সত্য,
তাহার উপরে নাই!’
বিবেকানন্দ বলেছেন-‘জীবে প্রেম করে যেই জন
ঈশ্বর সেবিছে সেই জন!’
তবে আমরাও  মহাজ্ঞানী মহাজনদের মতো সঠিক পথ অনুসরণ করে ধর্ম, গোত্র, নির্বিশেষ সকলকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, চলার পথকে সহজ ও সুন্দর করে এ পৃথিবীকে আরো অনেকদিন গ্লানিমুক্ত রাখতে পারি।
[বি. দ্রঃ আমি মানুষ হতে চাই! ] 

( লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, এম.এ. বাংলা , এল.এল.বি, swityrani17@gmail.com)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর