১৩ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, রাত ৯:১৯
নোটিশ :
Wellcome to our website...

।।কাওরান বাজার নিয়ে পূর্বাপর কথা।।

রিপোর্টার
সোমবার, ১৩ মে ২০২৪, ০৯:১৯ অপরাহ্ন

* মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব*
প্রথম পর্ব
(অ) বেশ কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি যে কাওরান বাজারস্থ পাইকারী ও খুচরা কাঁচা বাজার অন্য কোথায় স্থানান্তরিত হবে। এবার তা হয়তো বাস্তব রুপ নিতে চলেছে। এ সূত্র ধরে শুনেছি যে বর্তমান সরকার যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাতে মনে হয় শীঘ্রই গাবতলী/আমিন বাজার ও যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তরিত হবে এবং ইতিমধ্যে নাকি স্থানান্তরের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এ বিষয়টি না হয় পরে বলবো। এবার আসুন, কাওরান বাজারের কলেবর নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, রাজধানী ঢাকার বয়স প্রায় চারশো বছর। আর নগর ঢাকার বয়স আরও অনেক বেশি। এ শহরের প্রাচীনতম বিশাল মাদার বিপণিকেন্দ্র হলো কারওয়ান বাজার। দেশ তথা রাজধানীর খুচরা ও পাইকারী বাজারের মধ্যে এটি বড় ও বলতে গেলে শীর্ষে অবস্থান নিয়ে আছে। আর এই পুরাতন বাজারের নামকরণ নিয়ে ইতিহাসবিদগণ নানা কথা ও অভিমত ব্যক্ত করেছেন, যা পরবর্তী অধ্যায়ে তুলে ধরবো।
ঢাকা রাজধানীর সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় পাইকারি ও খুচরা বাজার হলো এই কাওরান বাজার। এটি তেজগাঁও থানার কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর পাশে প্রায় ৫০ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে। এখানে চারটি বিশেষায়িত মার্কেট ও অন্যান্য স্থাপনা মিলিয়ে দোকানের সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। শহরতলী সহ প্রায় দুই কোটি মানুষ অধ্যূষিত ঢাকা রাজধানীর এই বিশাল জনগোষ্ঠির খাদ্যপণ্য বিশেষ করে কাঁচা শাকসবজি, ফলমূল, মাছসহ নানা পণ্যের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% জোগান দেয় এই কাওরান বাজার। এই বাজারের সুবাদে প্রায় ২০ হাজারের মতো মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। আর পরোক্ষভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট আছে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। তাছাড়া আলোচনায় জানা যায় যে প্রত্যহ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা (আনুমানিক) ভেলোসিটি অব মানি সহ লেনদেন হয়। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভুত উন্নত হয়েছে বিধায় এমনও দেখেছি যে, কিছু কিছু চাকুরীজীবীরা দেশের গ্রামের বাড়ীতে যাওয়ার সময় এখান থেকে কাঁচা বাজার করে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদে জেনেছি যে, দেশে যা না পাওয়া যায়, এখানে তা পাওয়া যায়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, এই কাওরান বাজারে সরকারী ও বেসরকারী উভয় মালিকানায় মার্কেট রয়েছে, যেমন: (ক) ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত হলো ক্ষুদ্র আরৎ সমবায় সমিতি লিঃ; পাকা আড়ৎ ভবন; ক্ষুদ্র কাঁচামাল আড়ৎ মালিক সমিতি লিঃ; ১নং সুপার মার্কেট; ২নং সুপার মার্কেট; ৩নং ভবন কিচেন মার্কেট; মৎস্য টুল মার্কেট; কাঠপট্রি মার্কেট; ত্রিভুজ সুপার মার্কেট; এবং কামার সেট। এদিকে (খ) ব্যক্তি মালিকানার মধ্যে যেগুলো আছে, তা হলো: হক টাওয়ার; জাফরী ভবন; কাব্যকস মার্কেট; জালালাবাদ ভবন; হাসিনা মার্কেট; জহুর মোল্লা ফল মার্কেট; ৫টি আড়ৎ (গণপূর্ত); নবী সোলায়মান মার্কেট; ভান্ডারী মার্কেট; আবু সাইদ মার্কেট; ভান্ডারী মার্কেট (২); ইত্যাদি।
এই বাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে প্রতিটা সবজি এবং ফলের জন্য আলাদা আলাদা নির্ধারিত আড়ৎ রয়েছে। আর রয়েছে দূর দূরান্ত থেকে আসা মাছের বিশাল পাইকারি বাজার। বস্তুত মাছ, মুরগী, শুটকি, সবজি, মসলা ও মুদিপন্য থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় সব রকম সবজিই পাইকারি বিক্রয় হয়। এছাড়াও রয়েছে নির্ধারিত কামারপট্টি, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস মার্কেট। এতদ্ব্যতীত রয়েছে সব ধরনের হার্ডওয়্যার ও স্যানিটারি মার্কেট; আছে মুরগির আড়ৎ এবং জুতা ও জামা কাপড়ের বিশাল মার্কেট। এর বড় চমক হলো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বড় খোলা বাজার। ফলের আরতের ব্যাপারে লক্ষ্যনীয় যে মৌসুমী ফল সহ যাবতীয় সকল দেশী-বিদেশী ফল সর্বসময় পাওয়া যায়। আরেকটি বিষয় হলো যে ঢাকা রাজধানীর অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে এখানে ঢাকা ওয়াসা, বিটিএমসি ও টিসিবি সহ অনেক বড় বড় সরকারী সেবামূলক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, বেশ কতগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক মানবজিমন, দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং আরও অনেক খবরের কাগজের প্রধান অফিস কাওরান বাজারে অবস্থিত। এছাড়াও একুশে টেলিভিশন, এনটিভি, এটিএন বাংলা, এটিএন নিউজ, বাংলাভিশন, আরটিভি, ইত্যাদি টেলিভিশনের ষ্টুডিও সহ প্রধান কার্যালয় কাওরান বাজারে অবস্থিত। আসলে বর্তমানে শুধু বাণিজ্যিক এলাকা নয়, অফিস পাড়া হিসেবেও অভিহিত।
(আ) কাওরান বাজারের নামকরণের দিক দিয়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে বিভিন্ন ইতিহাসবিদরা নানা রকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন। প্রথমত তথ্য মতে জানা যায় যে, ভারতবর্ষের সম্রাট শের শাহ শূরী (১৫৩৮-১৫৪৫ ইং সাল) বাংলার রাজধানী সোনার গাঁ থেকে পাঞ্জাবের মূলতান পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক-ই-আজম (গ্রান্ড ট্রাঙ্ক) রোড নির্মান করেন। শুধু তাই নয়, পথচারীদের রাত্রি যাপন, নিরাপত্তা, সংবাদবাহকের (ডাক) ঘোড়া বদল, ইত্যাদি কারনে এ সড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বে দূরত্বে নিরাপত্তা চৌকি ও সরাইখানা স্থাপন করেছিলেন। হয়তো এই সড়ক কাওরান বাজারের পাশ দিয়ে গিয়েছিল অথবা কোন সংযোগ লেনের মাধ্যমে কাওরানবাজারের সংগে সংযুক্ত ছিল। আর এখানেও একটি চৌকিসহ সরাইখানা ছিল। এদিকে সরাইখানার ফারসি শব্দ হলো ক্যারাভাঁ বা ক্যারাভেন। এ সূত্র ধরে এই বাজারের নাম ক্যারাভেন বাজার হয়। তৎপর কালের পরিক্রমায় গণমানুষের সহজ উচ্চারনের সুবাদে এই স্থান বা বাজারের নাম ক্যারাভেন থেকে কাওরান বা কারওয়ান বাজার বলে অভিহিত হয়।
দ্বিতীয় অভিমত হলো ১৮শ শতাব্দীর শেষের দিকে কারওয়ান সিং নামে একজন মারোয়ারী এই জায়গায় প্রথম বাজার বসান। তিনি দূর-দূরান্ত এলাকা থেকে ফল এনে বিক্রি করতেন এখানে। আর কালক্রমে তাঁর নামেই কারওয়ান বাজার হিসেবে নাম পরিগ্রহ করে। তৃতীয়ত: জেমস রেনেলের তথ্যানুযায়ী বর্তমান যে রাস্তাটি পান্থপথ নামে পরিচিত; সেটি ছিল এক সময়ের পান্ডু নদী। এরই একটি ছোট শাখা হিসেবে কারওয়ান নদী ছিল। সেই নদী প্রকৃতগত ও মানুষ কর্তৃক ভরাট হয়ে এর উপর কাওরান বাজার গড়ে উঠে। সত্যি কথা বলতে কি, কারওয়ান বাজার নামকরণ নিয়ে আরও অনেক অভিমত আছে। তবে সরাইখানা তথা ক্যারাভাঁ বা ক্যারাভেন ধরে যে নামকরণ হয়েছে সেটিই অধিক গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়। মজার ব্যাপার হলো যে, লিখিতভাবে কাওরান বা কারওয়ান বাজার হলেও সর্ব সাধারণের কথ্য ভাষায় অপভ্রংশ হয়ে “কারণ বাজার” নামটি সবার মুখে মুখে বেশি প্রচলিত। কেননা ভাষা ব্যাকরণ অনুসরণ করে না; বরং ব্যাকরণই ভাষা যে পথে যায়, সেই পথ অনুসরণ করে থাকে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, কাওরান বাজারের সঙ্গে একটি প্রাচীন মসজিদের নাম জড়িয়ে আছে। আর সেটি হলো আম্বর শাহ মসজিদ। কেননা মসজিদটি কাওরান বাজারের মধ্যেই অবস্থিত। তথ্য মতে জানা যায় যে, খাজা আম্বর শাহ ছিলেন শায়েস্তা খানের খোজা প্রধান। মসজিদটি তিনি তৈরী করেছিলেন ১৬৭৯-১৬৮০ সালে। প্রাচীনত্বের দিক দিয়ে ঢাকার মসজিদগুলোর মধ্যে এর স্থান দ্বাবিংশতম। আর এই মসজিদের পাশেই সমাহিত আছেন খাজা আম্বর শাহ। অবশ্য এই প্রাচীন মসজিদটি পরবর্তীতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কয়েকবার সংস্কার সাধন করা হয়েছে।
(ই) আশ্চর্যর বিষয় হলো যে এই কাওরান বাজারের রাতে এক রূপ এবং দিনে আরেক রূপ। মূলত: হাজার হাজার মানুষের হাঁক-ডাক, রেডিয়েট আলোয় দর কষাকষি, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যপারীদের লাভ ক্ষতি হিসাবের টক-ঝাল-মিষ্টি কথা, টুকড়ি মাথায় মিনতীদের দৌড়াদৌড়ি, মাল কেনার আশে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা, পরিবহন ব্যবসায়ী, শ্রমিক, আড়ৎদার, মিডলম্যান, ইত্যাদিতে মুখর থাকে রাত। আর রাতের ব্যস্ততাই যেন কাওরান বাজার সজিব হয়ে উঠে নিজের স্বকীয়তা সবাইকে জানিয়ে দেয়। এ সূত্র ধরে উল্লেখ্য যে, রাত ১০টা বাজতে না বাজতেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পণ্য বোঝাই ট্রাক একের পর এক আসা শুরু হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, প্রতি রাতে আসা পন্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা আনুমানিক ১২ শত থেকে দেড় হাজারের মতো। যাহোক, রাত যখন ১১টা বাজে। তখন পন্যদ্রব্য খালাস শুরু হয়। এক্ষেত্রে ট্রাক থেকে প্রথম ভ্যানে নামানো হয়। তৎপর ভ্যানে করে আড়তে জমা করা হয়। পরবর্তীতে আড়ৎ থেকে কিনে পাইকাররা সারা রাজধানীর খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় করে। শুধু রাজধানী নয়। অনেক সময় দেখা গিয়েছে, দেশের যে এলাকায় শাক-সবজি কম জন্মায়, সেখানেও পাইকাররা নিয়ে যায়। এই যে আড়ৎ থেকে মাল বিক্রয় হয়; সেক্ষেত্রে আড়তদার কেজি প্রতি ১.০০ টাকা করে কমিশন বা আড়তদারী পেয়ে থাকে। এই কমিশন, ব্যাপারী তথা পন্যর মালিক দিয়ে থাকে। আর আড়ৎ থেকে পন্যদ্রব্য লাগাতারভাবে বিক্রয় চলে সকাল ৭/৮ পর্যন্ত। এদিকে দিনের সকাল ৮ টার পর কাওরান বাজারের চেহারা পাল্টে যায়। খোলা সকল জায়গায় খুচরা ব্যবসায়ীদের জমজমাট অবস্থা এবং জনাকীর্ণ হয়ে উঠে। অবশ্য রাতেও ব্যাপারী এবং পাইকারসহ নানা ধরনের ক্রেতার সমাগম কম নয়? এক্ষেত্রে যাই বলি না কেন, পন্যদ্রব্য কেনা বেচার দিক দিয়ে কাওরান বাজার দেশের বিপণন সহ অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সত্যি কথা বলতে কি, সারা দেশের যে কোন প্রান্তে শাক-সবজি দাম উঠানামা করে কাওরান বাজারে সরবরাহ বা যোগান ও পাইকারী দামের উপর ভিত্তি করে। তাই সারা দেশের কাঁচামাল ব্যবসায়ীদের কাছে এ বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। এ পরিপ্রেক্ষিতে কাওরান বাজারকে কাঁচা মালের কগ মার্কেটি সেন্টার (ঈড়ম গধৎশবঃ ঈবহঃৎব) বললে অত্যুক্তি হবে না।
দ্বিতীয় পর্ব
(ঈ) ইদানিং কাওরান বাজার নিয়ে পত্র-পত্রিকা সহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে একটি কথা সবার মুখে মুখে, তা হলো কাওরান বাজার শীঘ্রই গাবতলী (আমিন বাজার) এবং যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তরিত হবে। শুধু তাই নয়, বাস্তবেই হওয়ার পথে। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলছেন যে ভালই হবে। যানজট নিরসন হবে এবং বলতে গেলে এত ভীড়ের জন্য কাওরান বাজারে ঢুকাই যায় না। আবার কেউ কেউ বলছেন, হাতের কাছে এই রকম ফ্রেস বা সজীব পন্য দ্রব্য পাবো না এবং পেলেও পরিবহন খরচ বেরে যাবে; ইত্যাদি; ইত্যাদি। তাছাড়া অনেকে বলছেন যে স্থানান্তরের কারনে কাওরান বাজারকে ঘিরে চলমান ট্রেন্ড ও নরম পরিবর্তিত হবে। এতে ব্যবসায়ীদের নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। আর এই কাঁচা বাজার সরানোর সপক্ষে যে কথা উঠে এসেছে তা হলো- এ বিশ্বের উন্নত দেশে রাজধানীর মাঝখানে কোথাও এমন পচনশীল পন্য দ্রব্যর কাঁচা বাজার নেই। আর এ কাঁচা বাজারের কারনে নানা ধরনের গাড়ীসহ বহু ট্রাকের আনাগোনার জন্য যানজট সৃষ্টি হয়, যা অনভিপ্রেত। অবশ্য অনেক জ্ঞানী ও চিন্তাশীল লোকেরা বলে থাকেন, আমরা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ। তাই উন্নত বিশ্বের বিষয় বিবেচনা করা হলেও আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্যারামিটারগুলো মাথায় রাখা সমীচীন বলে মনে করি। এদিকে এই কাঁচাবাজার ভবন অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ এবং জীবনের জন্য হুমকীস্বরূপ বলে অনেকে বিভিন্ন ফোরামে উল্লেখ করেন।
কাওরান বাজার স্থানান্তর নিয়ে কথার শেষ নেই। এই কয়দিন আগে কাওরান বাজারস্থ একটি চায়ের দোকানে চা খাচ্ছি। সেই সময় দেখলাম শিক্ষিত, অশিক্ষিত ও ব্যবসায়ীসহ অনেক লোকের সমাগম। সবারই মধ্যে আলোচনার একই বিষয়বস্তু এই কাওরান বাজারকে ঘিরে। এক পর্যায়ে একজন কেতাদুরস্ত লোকের কথাবার্তায় মনে হলো তিনি হয়তো একজন অফিসার হবেন। তিনি বলেন যে, এখান থেকে কাঁচা বাজার গেলে খুবই ভাল হবে। আর সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমি ওয়েলকাম করি। এ ব্যাপারে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন যে, এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে সরকারী ও বেসরকারী অনেক অফিস আছে। সকাল বেলায় ৯টার সময় যখন অফিস আসি, তখন বলতে গেলে লোকের ভীড়ে গাড়ী নিয়ে ঢুকতে প্রায় আধা ঘন্টা লেগে যায়। এ কথা সোনার পর, সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলো। অনেকে মুচকী হেসে চা খাওয়ায় মনোনিবেশ করলো। ঠিক এর দু’দিন পর, যখন সেই চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়েছি। তখন দেখি, স্থানীয় পত্রিকার ক’জন সাংবাদিক এই কাওরান বাজার নিয়ে কথা বলছেন। যেহেতু কাওরান বাজার নিয়ে আমি একটি আর্টিকেল লেখছি, তাই কান খারা করে রাখলাম। কে কি বলেন? সবাই এ নিয়ে মিশ্র নানা কথা বললেও, একজন মধ্যবয়সী সাংবাদিকের কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হলো। তিনি বলেন যে, এই কাওরান বাজার শত শত বছরের পুরাতন এবং একই সঙ্গে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে এটি দেশের ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত। দেশ তো দূরে থাক, বিদেশেও অনেকে কাওরান বাজারকে উচ্চ মাত্রায় দেখে থাকেন। তাই বিভিন্ন জায়গায় এইভাবে স্থানান্তরিত করা হলে, সেটি একজন সুস্থ্য মানুষের ব্যবচ্ছেদের মতো হয়ে উঠবে। এই রকম ইতি ও নেতিবাচক অনেক কথা হচ্ছে। আরও হবে। আর এটিই স্বাভাবিক।
(উ) কাওরান বাজারের স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে লেখক হিসেবে অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি। আসলে নতুন কোন কিছু করতে বা উদ্যোগ নিলে শাশ্বত ধারায় শতভাগ রক্ষা তথা সব কুল রক্ষা করে সম্পাদন করা যায় না। কিছু না কিছু ক্ষতি হবেই। তবে বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষতিকে ততটা আমল না দেয়াই বোধ হয় সমীচীন। আমরা যদি উদ্ভুত ইতি ও নেতিবাচক প্যারামিটার যেমন- রাজধানীর কেন্দ্রে তথা নাভীতে পচনশীল কাঁচাবাজার, যানজট, শত শত বছরের পুরাতন ঐতিহ্য, লক্ষ লক্ষ ব্যবসায়ীদের আর্থিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চলমান আর্থ-সামাজিক কালচার, ঝুকিপূর্ণ ভবন, বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যা স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ, ডিজিট্যাল ও স্মার্ট যুগের মানুষের পরিবর্তিত স্বভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, একই স্থানে মাত্রাতিরিক্ত লোকের সমাবেশ কাঁচামালের উচ্ছিষ্টাংশের জমে থাকা বর্জ্য দ্রুত অপসারণে নেতিবাচক অবস্থার কারণে উদ্ভুত দূষিত পরিবেশ, আদর্শ বাণিজ্যিক এলাকার বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ইত্যাদি নিয়ে যদি বিশ্লেষন করি, তাহলে আমাদের এমন কিছু করা শ্রেয় যে, লক্ষ লক্ষ ব্যবসায়ী ও জনসাধারনের যত দূর সম্ভব স্বার্থ সংরক্ষণপূর্বক এই কাঁচা বাজার স্থানান্তরের উপর গুরুত্ব দেয়া বিধেয় এবং যুক্তিযুক্ত।
পরিশেষে এই বলে ইতি টানছি যে, উক্ত কাঁচা বাজার স্থানান্তর করার সারথী ধরে এগিয়ে যাওয়ার পথে, এর সংগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ যেন তেমন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়; সে দিকে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে মায়ের ভূমিকা নিয়ে চোখ-কান খোলা রাখা সমীচীন বলে মনে করি।

সহায়ক সূত্রাদি:
১। প্রথম আলো (১৮-১১-২০২২)
২। উইকিপিডিয়া
৩। অনলাইন নিউজ
(ক) জাগো নিউজ-২৪
(খ) সময় নিউজ
(গ) যুগান্তর প্রতিদিন
(ঘ) প্রতিদিনের বাংলাদেশ
৪। হাজী মো. লোকমান হোসেন, সেক্রেটারী, কিচেন মার্কেট, কাওরান বাজার, ঢাকা।
৫। মোঃ ফখরুল ইসলাম খোকন, কালেক্টর, কিচেন মার্কেট, কাওরান বাজার, ঢাকা।
৬। মো. আব্দুর রাজ্জাক, কাঁচা মালের ব্যবসায়ী
৭। লেখকের সরেজমিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা
৮। ইত্যাদি।
বিশিষ্ট গবেষক, অর্থনীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর